জাতীয় শীর্ষ দুই

প্রশাসনের টেবিলে আর ঝুলবে না ফাইল: কারণ না জানিয়ে ‘নাগরিকের আবেদন’ আটকে রাখা অবৈধ ঘোষণা হাইকোর্টের

হাইকোর্টের প্রতীক এবং সরকারি অফিসে নাগরিকের আবেদন ফাইলের স্তূপ
নাগরিকের আবেদন পাওয়ার পর কোনো কারণ না দেখিয়ে সরকারি অফিসে তা অনির্দিষ্টকাল ধরে ফেলে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো উপযুক্ত সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে সাধারণ মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত চেয়ে দরখাস্ত করেন, তখন যুক্তিযুক্ত সময়ের মধ্যে লিখিত ও যুক্তিসঙ্গত কারণসহ আদেশ প্রদান করা প্রশাসনের মূল দায়িত্ব।
একনজরে হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
    • সরকারি দফতরে কোনো কারণ না জানিয়ে নাগরিকের ফাইল বা দরখাস্ত মাসের পর মাস আটকে রাখা যাবে না।
    • অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইল ঝুলিয়ে রাখা নাগরিকের সময়মতো বিচার বা সিদ্ধান্ত পাওয়ার বৈধ প্রত্যাশাকে সরাসরি ক্ষুণ্ন করে।
    • আবেদন গ্রহণ কিংবা বাতিল—যা-ই হোক না কেন, তা আবেদনকারীকে সুনির্দিষ্ট কারণসহ লিখিতভাবে জানাতে হবে।
    • রায় অনুযায়ী, যুক্তিযুক্ত সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত কারণসহ আদেশ প্রদান করা প্রশাসনের অন্যতম প্রাথমিক শর্ত।

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ভাঙতে উচ্চ আদালতের কঠোর অবস্থান
আমাদের দেশের প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সরকারি অফিসে কোনো কাজের জন্য ফাইল জমা দিলে তা কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। দিনের পর দিন টেবিলে টেবিলে ঘুরেও হদিস মেলে না একটি সাধারণ দরখাস্তের। বেশিরভাগ সময়ই কোনো কারণ না জানিয়েই মাসের পর মাস ফাইল ফেলে রাখার একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। হাইকোর্টের এই নতুন ও যুগান্তকারী নির্দেশনার ফলে সেই পুরনো এবং জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থার মূলে বড় আঘাত এসেছে।
আদালতের রায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, শাসক হিসেবে নয়। তাই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত কোনো দফতরে সাধারণ মানুষকে কারণ ছাড়া দিনের পর দিন ঘোরানো বা ফাইল আটকে রাখা বরদাশত করা হবে না। প্রতিটি সরকারি টেবিল এবং ফাইল নড়াচড়াকে এখন থেকে আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে।
সময়াবদ্ধ সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের বাধ্যবাধকতা
শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা মূলত দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনি অধিকারকে সুসংহত করে। কোনো কারণে যদি একটি আবেদন আইনগতভাবে গ্রহণ করার যোগ্য না-ও হয়, তবে তাও রোগা জবাবে ঝুলিয়ে না রেখে সরাসরি আইনগত কারণসহ বাতিল বা নিষ্পত্তি করতে হবে। যাতে সংশ্লিষ্ট নাগরিক অন্তত বুঝতে পারেন তার ফাইলের বর্তমান অবস্থা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ঠিক কী হতে পারে।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার যুগে এখন অনেক ফাইলই কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ফলে কোন টেবিলে কতদিন একটি ফাইল আটকে রয়েছে, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সহজেই তদারকি করতে পারেন। এই রায়ের পর কাজে অবহেলা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাইল আটকে রাখার কালচার বন্ধ করতে প্রশাসনিক মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় মাইলফলক
সাধারণত সরকারি দফতরগুলোতে ফাইল আটকে রাখার মূল উদ্দেশ্যই থাকে টেবিলের তলা দিয়ে কোনো অনৈতিক সুবিধা বা ঘুষ গ্রহণ করা। কারণ না জানিয়ে ফাইল ফেলে রাখার এই আইনি ফাঁকফোকর সম্পূর্ণ বন্ধ হলে দুর্নীতি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যখন একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানবেন যে ফাইল আটকে রাখার পেছনে তাকে সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ কারণ নথিতে লিখে নাগরিককে জানাতে হবে, তখন তিনি নিয়ম মেনে দ্রুত কাজ করতে বাধ্য হবেন।
প্রশাসনিক এই কাঠামোগত সংস্কার এবং আদালতের কঠোর মনোভাবের ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরবে। নাগরিকরা এখন তাদের অধিকারের জায়গা থেকে সরাসরি প্রশাসনের কাছে কাজের হিসাব এবং বিলম্বের কারণ জানতে চাইতে পারবেন। এটি দেশের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।
জনস্বার্থ রক্ষা ও রায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ
জনগণ যখন জানতে পারবে যে তাদের প্রতিটি নাগরিকের আবেদন একটি নিশ্চিত ও সময়াবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যাবে। জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের সর্বোচ্চ সচিবালয় পর্যন্ত সব স্তরে এই নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। উচ্চ আদালতের এই রায় মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ তদারকি সেল গঠন করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ এর প্রকৃত সুফল দ্রুত ভোগ করতে পারেন।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র