অর্থ-বাণিজ্য জীবনযাপন দেশ সংযোগ

রান্নাঘরে নতুন অস্বস্তি: অক্টোবরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৪.৩৯ শতাংশ, শীর্ষে মাছ

অক্টোবরে নিত্যপণ্যের দাম এবং মাছের বাজারে ক্রেতাদের ভিড়
নিত্যপণ্যের দাম দেশের সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার এক নতুন খতিয়ান প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর মাসে খাদ্য ও সাধারণ পণ্যের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। বিবিএস-এর সর্বশেষ অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক বাজারের খরচ ৪.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন করে তুলেছে।
একনজরে বাজারের সর্বশেষ পরিস্থিতি
  • সদ্য বিদায়ী অক্টোবর মাসে সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম ৪.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
  • এই দফায় সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সব ধরনের দেশি ও চাষের মাছের বাজারে।
  • বন্যা এবং সরবরাহ লাইনে ত্রুটির কারণে শীতকালীন আগাম সবজির বাজারেও অস্বস্তি কাটেনি।
  • চাল ও ডালের মতো অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম আগের মাসের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল ছিল।
অক্টোবরের বাজার বিশ্লেষণে মূল্যস্ফীতির আসল চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নিয়মিত মাসিক বাজার জরিপ থেকে এই উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবরে সাধারণ মানুষের রান্নার খরচ এবং দৈনন্দিন বাজার খরচ এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শহর অঞ্চলের কাঁচাবাজারগুলোতে পণ্যের আগমন কম থাকায় দামের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ার কারণেই তারা বেশি মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং সেল বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করলেও তার কোনো স্থায়ী সুফল মিলছে না। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী চক্র মুনাফা লুটছে বলে অভিযোগ সাধারণ ক্রেতাদের। তবে বিবিএস-এর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হওয়া অতিবৃষ্টি ও বন্যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই মাসের পরিসংখ্যানে।
মাছের বাজারে আগুন: সাধারণ মানুষের পাতে উঠছে না ইলিশ-রুই
অক্টোবর মাসের মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় যে পণ্যটি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে, তা হলো মাছ। রুই, কাতলা, পাঙাশ থেকে শুরু করে ছোট চুনো মাছ—সবকিছুর দামই এখন সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে। এমনকি চাষের মাছের কেজিতেও ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নদী ও সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজারে এই সংকটের তীব্রতা আরও বেড়েছিল।
আমিষের চাহিদা মেটাতে মাছের ওপর নির্ভরশীল একটি বড় জনগোষ্ঠী এখন বিপাকে পড়েছেন। মাংসের দাম আগে থেকেই চড়া থাকায় মাছ ছিল মধ্যবিত্তের শেষ ভরসা, কিন্তু এখন সেই আশাতেও গুড়ে বালি। আড়তদারদের বক্তব্য, জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছ ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে নিয়ে আসতে খরচ অনেক বেশি হচ্ছে।
শীতের আগাম সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের হালচাল
মাছের পাশাপাশি কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ ও রসুনের বাজারেও অক্টোবর মাসজুড়ে বেশ অস্থিরতা ছিল। যদিও এই সময়ে বাজারে শীতকালীন আগাম সবজি যেমন শিম, ফুলকপি ও বাঁধাকপি আসতে শুরু করেছে, কিন্তু তা চড়া মূল্যের কারণেই সাধারণ মানুষের পাতে উঠছে না। বাজারে যেকোনো নতুন সবজির দাম কেজিতে ১০০ টাকার নিচে নামছে না। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকায় স্থানীয় বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা করা হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা জানালেও মাঠপর্যায়ে তার সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। টিসিবির ট্রাক সেলের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিতরণের পরিধি আরও বাড়ানো দরকার বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। কারণ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেভাবে কমছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আয়ের উৎস বাড়ছে না।
আগামী দিনগুলোতে বাজার কোন দিকে যাবে
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বর মাসে শীতের সবজি পুরোপুরি বাজারে এলে মূল্যস্ফীতির এই চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে মাছ ও মাংসের মতো আমিষ জাতীয় পণ্যের দাম সহসাই কমার কোনো লক্ষণ নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশের ভেতরের লজিস্টিকস সাপোর্ট এবং পাইকারি বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা অত্যন্ত জরুরি।
সরকার যদি এখনই মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে শীতের আমেজ শুরু হলেও সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের উত্তাপ কমবে না। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যাতে অন্তত বেঁচে থাকার নূন্যতম উপাদানগুলো সহজে সংগ্রহ করা যায়।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জীবনযাপন ফিচার ভ্রমণ

প্যালেস সাজাতে খরচ প্রায় ২৪০ কোটি টাকা

আলেকজান্ডার প্যালেস। বন্ধ থাকা প্রাসাদটি খুলে দিতে সাজানোর জন্য খরচ করতে হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার (প্রায় ২৪০ কোটি
জীবনযাপন

পাটে বস্তা ব্যবহার নিশ্চিতে অভিযান

বর্তমান সরকার পাট পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার এর লক্ষ্যে “পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০”  বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এই আইনের