হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত এলাকায় আরও দুটি নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের একটি চরাঞ্চলে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে, যা স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত কয়েক দিনে ওই এলাকায় একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
একনজরে মূল পরিস্থিতি
-
- কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় হামের সদৃশ উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
- মৃত শিশুরা চরের বাসিন্দা এবং তারা সরকারি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে ছিল বলে জানা গেছে।
- আক্রান্ত এলাকায় জরুরি মেডিকেল টিম গঠন করে পাঠিয়েছে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
- চরাঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়াই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ।
দুর্গম চরাঞ্চলে রোগের প্রকোপ ও মৃত্যুর নেপথ্য কারণ
কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদ পরিবেষ্টিত দুর্গম চরের জনপদগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মৃত দুই শিশুই তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে র্যাশ বা গুটি এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিল। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, এগুলো স্পষ্টতই হামের লক্ষণ হলেও ল্যাব পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট আসার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে লক্ষণগুলো যে অত্যন্ত মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে, তা শিশুদের দ্রুত মৃত্যুর ধরণ দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে।
চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অসচেতনতা এবং অন্ধবিশ্বাসের কারণে অনেক সময় শিশুরা সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। জ্বর বা শরীরে গুটি দেখা দিলে স্থানীয় কবিরাজ বা ওঝার শরণাপন্ন হওয়ার একটি প্রবণতা এখনও গ্রামীণ সমাজে রয়ে গেছে। যখন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, কেবল তখনই তারা শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায় এবং পথেই অনেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র
এই দুঃখজনক মৃত্যুর পর ইমিউনাইজেশন বা টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জানা গেছে, দুর্গম চরের অনেক জোভনেই নিয়মিত সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীরা ঠিকমতো পৌঁছাতে পারেন না। যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম বেহাল দশা এবং নৌকার অভাবকে এর জন্য দায়ী করছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। ফলে এই সব চরের বিশাল সংখ্যক শিশু হাম ও রুবেলার মতো মারাত্মক ভাইরাসের টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি দল ইতিমধ্যে আক্রান্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করে একটি জরুরি জরিপ পরিচালনা করেছেন। তারা দেখেছেন যে, শুধু এই মৃত দুটি শিশুই নয়, ওই এলাকার আরও অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শিশু একই রকম জ্বরে আক্রান্ত। তাদের দ্রুত আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং যাদের এখনও টিকা দেওয়া হয়নি, তাদের জন্য বিশেষ ক্যাম্পের আয়োজন করা হচ্ছে।
মহামারি রূপ নেওয়া রুখতে প্রশাসনের জরুরি পদক্ষেপ
আক্রান্ত চরাঞ্চলে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চার সদস্যের একটি বিশেষ মেডিকেল টিম পাঠানো হয়েছে। এই টিম বাড়ি বাড়ি গিয়ে অসুস্থ শিশুদের চিহ্নিত করছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সরবরাহ করছে। গুরুতর অসুস্থদের অনতিবিলম্বে মূল ভূখণ্ডের হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সার্বিক অবস্থা অবহিত করা হয়েছে। চরের প্রতিটি ঘরে যেন স্বাস্থ্য বার্তা পৌঁছায়, সেজন্য স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাতব্বরদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। কোন শিশু যাতে টিকার আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই
একটি ছোট্ট অসচেতনতা বা অবহেলা যে কতটা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি মা-বাবাদেরও সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলার যে দুটি নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়, তা কোনোভাবেই মিস করা যাবে না।
শীতের এই সময়ে সাধারণত এই ধরনের ছোঁয়াচে রোগের প্রকোপ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তাই শিশুর শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা তীব্র জ্বর দেখা দিলে সাথে সাথে নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিক বা হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। তবেই হয়তো আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া রুখতে পারব।