শীতের আগমনী বার্তার মাঝেও দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে, যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ৩ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ৬৭৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের শয্যায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের মূল চুম্বক অংশ:
- গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ জনের দুঃখজনক মৃত্যু।
- নতুন করে ১ হাজার ৬৭৪ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি।
- আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকার হাসপাতালেই বড় অংশ চিকিৎসাধীন।
- চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু হার বিগত কয়েক মাসের তুলনায় আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রাজধানী ও ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেই সিংহভাগ রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি থাকায় এই অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। তবে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ রোগীর শরীরেই ডেঙ্গুর নানাবিধ জটিল উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং শক সিনড্রোমের কারণে রোগীদের অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। সঠিক সময়ে হাসপাতালে না আসা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘরে বসে প্যারাসিটামল বা অন্যান্য ওষুধ সেবনের কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
এডিস মশা নিধন ও সচেতনতার ঘাটতি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ের বৃষ্টিপাত এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে না পারাই ডেঙ্গুর এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকোপের প্রধান কারণ। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন পৌরসভাগুলোতে মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। লার্ভিসাইড ও ফগিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ জনগণের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
পাশাপাশি, বাসাবাড়ির ছাদবাগান, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা ফুলের টবে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ঘরের ভেতরের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও এই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। মহামারি প্রতিরোধ করতে হলে কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর ভরসা না করে প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।
হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট ও চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ
ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং ডিএনসিসি ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে কোনো সিট খালি নেই। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে অনেককে হাসপাতালের মেঝে কিংবা বারান্দায় মশারী টাঙিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ঠিক থাকলেও জনবলের অভাবে নার্স ও চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের প্রটোকল মেনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করলেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা ঢাকার হাসপাতালগুলোতে আসার পর সংকটের তীব্রতা আরও বাড়ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু হার নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অন্যথায়, শীত পুরোপুরি জেঁকে বসার আগ পর্যন্ত এই ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।