রাজনীতি

আদর্শিক ফাটল নাকি ক্ষমতার কোন্দল? আলোচিত নারী নেতারা কেন এনসিপি ছাড়ছেন

জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নারী নেত্রীদের পদত্যাগ ও রাজনৈতিক সংকট
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের কোণঠাসা করার তীব্র অভিযোগ তুলে ‘এনসিপি নারী নেতৃত্ব’ এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। গত কয়েক মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে একের পর এক শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী নারী নেত্রীর পদত্যাগের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনের আকস্মিক পদত্যাগ এই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও আদর্শিক বিরোধকে পুরোপুরি প্রকাশ্যে এনেছে。
নেপথ্যের প্রধান প্রধান কারণসমূহ:
  • জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিতর্কিত জোট: নীতিগত ও কৌশলগত অমিল থাকা সত্ত্বেও কট্টরপন্থী শক্তির সঙ্গে আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক মোর্চা গঠন।
  • নারী নেতৃত্বের চরম অবমূল্যায়ন: ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামে তাদের কোণঠাসা করে রাখা।
  • অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব: কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কাউন্সিল ছাড়াই বারবার কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন বা ‘রিস্ট্রাকচার’ করা।
  • আদর্শিক বিচ্যুতি: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়ে পুরোনো ধারার ‘ক্ষমতার রাজনীতি’র দিকে ঝুঁকে পড়া।
জামায়াত তোষণ ও আদর্শিক বিচ্যুতির গুরুতর অভিযোগ
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ভেতরে মূল ফাটলটি তৈরি হয় মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা এবং রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের বিষয়টি দলের প্রগতিশীল ও তরুণ নেতাদের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। সেই সময় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিবের পদ থেকে প্রথম পদত্যাগ করেন সুপরিচিত চিকিৎসক ডা. তাসনিম জারা。 তার পরপরই একই কারণে দল ছাড়েন আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন।
নেত্রীদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, জামায়াত কোনোভাবেই এনসিপির দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সামান্তা শারমিন তার পদত্যাগপত্রে কঠোর ভাষায় উল্লেখ করেছেন, জামায়াতকে বন্ধু মনে করার কারণে দেশের সাধারণ ও উদারপন্থী মানুষ এই নতুন দলটির ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। নিজের স্বাধীন রাজনৈতিক লাইন না থাকায় এনসিপি ধীরে ধীরে কট্টর ডানপন্থী শক্তির লেজুড়বৃত্তিতে পরিণত হচ্ছে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও কোণঠাসা নারী নেতৃত্ব
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে যে নারীরা আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, নতুন দল গঠনের পর তাদেরই পেছনে ঠেলে দেওয়ার এক সুপ্ত চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পদত্যাগী নেত্রীদের দাবি, এনসিপির সামনে সুযোগ ছিল পুরোনো দলগুলোর বাইরে এসে একটি সমতাভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করার। কিন্তু বাস্তবে দলের গুরুত্বপূর্ণ ১৬ সদস্যের রাজনৈতিক কাউন্সিলে মাত্র দুজন নারীকে রাখা হয়েছে, যা এক প্রকার প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব মাত্র।
গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের জোরালো প্রতিবাদকে পাত্তাই দেওয়া হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের আপেক্ষিক মতামতের ভিত্তিতেই সব বড় বড় এজেন্ডা পাস করা হতো। ফলে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলার এই চরম অবমাননা মেনে নিতে না পেরেই তারা দল ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
কাউন্সিলবিহীন কমিটি ও ক্ষুণ্ন হওয়া রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা
দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার অভাবকে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন পদত্যাগী নেতারা। গত ২৩শে অক্টোবর কোনো ধরনের দলীয় কাউন্সিল না করেই হুট করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় রদবদল আনা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সামান্তা শারমিনকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে নামিয়ে সাধারণ যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।
নেত্রীদের মতে, যে রাজনৈতিক দল নিজের অভ্যন্তরে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের মুখে রাষ্ট্র সংস্কার কিংবা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি কতটা জনআস্থা পাবে—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গেছে। পুরোনো দলগুলোর মতোই অসন্তোষ ও ভিন্নমতকে দমন করার এই অপকৌশল এনসিপির গ্রহণযোগ্যতাকে চরম সংকটে ফেলেছে। তবে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব এই অভিযোগগুলোকে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বলে উড়িয়ে দিলেও, সাধারণ জনগণের চোখে তরুণদের এই দলটির ভবিষ্যৎ ইমেজ এখন বড়সড় ধাক্কার সম্মুখীন।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

দেশ সংযোগ রাজনীতি

বাংলার মানুষকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসতেন বলেই তিনি বঙ্গবন্ধু হয়েছেন: আইনমন্ত্রী

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ছয়দফা দিয়েছিলেন বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। বাংলার মানুষের অধিকার
দেশ সংযোগ রাজনীতি

“বাংলাদেশের নির্বাচনে কখনোই হস্তক্ষেপ করবে না চীন”

ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে চীন। বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ