বিশ্বজুড়ে চলমান চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে তীব্র জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করছে প্রায় ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ, যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম সংকটাপন্ন সারিতে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা সম্প্রতি এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার কারণে যারা ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তারা এখন নতুন করে প্রকৃতির রুদ্ররূপের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বনেতাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মানবিক সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এক নজরে প্রতিবেদনের মূল তথ্যসমূহ:
-
- বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুত ও গৃহহীন জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চরম পরিবেশগত সংকটের মুখে রয়েছেন।
- বাংলাদেশ, মিয়ানমার, সুদান এবং সোমালিয়ার মতো দেশগুলো এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার।
- ২০৪০ সালের মধ্যে চরম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পড়া দেশের সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা।
- জলবায়ু তহবিলের অর্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে ব্যবহারের তাগিদ।
বাস্তুচ্যুতির পর নতুন আপদ পরিবেশগত বিপর্যয়
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই আশ্রয় নিয়েছে এমন সব দেশে, যেখানে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত আঘাত সবচেয়ে বেশি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরের দিকে তাকালে এই বাস্তব চিত্র পরিষ্কার বোঝা যায়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং তীব্র তাপদাহের মতো ঘটনাগুলো এই অস্থায়ী আশ্রয়স্থলগুলোকে প্রতিনিয়ত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘর ছাড়া এই মানুষগুলোর সামনে এখন মাথা গোঁজার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। একদিকে নিজের মাতৃভূমি ছাড়ার বেদনা, অন্যদিকে নতুন আশ্রয়ে প্রকৃতির বৈরিতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ পরিবার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই দ্বিমুখী সংকট সমাধানে এগিয়ে না আসে, তবে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করবে।
ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূল ও শরণার্থী শিবির
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সবসময়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করে। জাতিসংঘের নতুন এই ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল এবং সেখানে বসবাসকারী অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষজন সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করছে। প্রতি বছর নদীভাঙন এবং লবণাক্ত পানির আগ্রাসনে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের বাড়তি চাপ।
কক্সবাজারের পাহাড় কেটে তৈরি করা অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক ভূমিধস এবং বন্যার ঝুঁকিতে পড়ে। প্রতি বছর ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখানকার ঘরবাড়ি ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বাংলাদেশে আশ্রিত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বনেতাদের অর্থায়ন ও উদাসীনতার খতিয়ান
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে দেশগুলো সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে, তারাই সবচেয়ে বেশি খেসারত দিচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করতে না পারলে বিশ্বকে একটি বড় মূল্য চকাতে হবে। আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে যে অর্থ ছাড় করা হয়, তার খুব সামান্য অংশই বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় পৌঁছায়।
সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ভঙ্গুর দেশগুলোর জন্য অভিযোজন তহবিল বা ‘অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড’ দ্বিগুণ করতে হবে। শুধুমাত্র কাগজের কলমে নীতি নির্ধারণ না করে মাঠ পর্যায়ে টেকসই অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি। জলবায়ুর এই চরম পরিবর্তনের লাগাম টেনে না ধরলে আগামী দুই দশকে বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্ধকার বার্তা
যদি বর্তমান ট্রেন্ড বা ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৪০ সালের মধ্যে চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি দেশের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে। শিশুরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে, অপুষ্টির হার বাড়বে এবং কাজের খোঁজে বাস্তুচ্যুত মানুষের দল শহর অভিমুখে যাত্রা করবে। এতে করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলোকে বুঝতে হবে যে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আজকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের পাশে না দাঁড়ালে এই সংকটের আঁচ একদিন সবার গায়েই লাগবে। তাই আর সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে বৈশ্বিক সংহতি প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি।