ফিচার বিশ্ব সংযোগ

রাশিয়ায় পাচার হওয়া বাংলাদেশিদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে

আকাশচুম্বী বেতন আর উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল একদল বাংলাদেশি যুবককে। কিন্তু মস্কো পৌঁছানোর পরই তাদের সেই রঙিন স্বপ্ন মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে চরম দুঃস্বপ্নে। নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মারণাস্ত্র, আর জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখ সমরে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক রোমহর্ষক অনুসন্ধানে সম্প্রতি উঠে এসেছে মানবপাচারের এই ভয়াবহ চিত্র।

রাশিয়ায় কাজের সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে এপি-র এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি সুসংগঠিত চক্র উচ্চ বেতনের ‘সেবামূলক’ বা ‘নির্মাণ কাজের’ প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের রাশিয়ায় পাচার করছে। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীর সহায়ক বাহিনীতে যুক্ত করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, অনেককেই বলা হয়েছিল তারা হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা হোটেলের সহায়ক হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পর তাদের দেওয়া হয়েছে সামরিক পোশাক। ভাষা না বোঝায় অনেক বাংলাদেশি বুঝে ওঠার আগেই বিপজ্জনক সব চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর আগে তাদের দেওয়া হচ্ছে নামমাত্র কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকার জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।

এই মানবপাচারের শিকড় অনেক গভীরে। দালালরা মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের টার্গেট করছে। ‘ভিসা ফ্রি এন্ট্রি’ বা ‘সহজ ইমিগ্রেশন’-এর টোপ দিয়ে জনপ্রতি কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। পাচার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর বরাত দিয়ে এপি জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পর অনেকের সঙ্গেই পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যারা কোনোমতে যোগাযোগ করতে পেরেছেন, তারা জানিয়েছেন যে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে তাদের ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতার ফলে রুশ বাহিনীতে যে সৈন্য সংকট তৈরি হয়েছে, তা মেটাতেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে কৌশলে এই ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত ও নেপালের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

এপি-র অনুসন্ধানে উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:

  • প্রতারণার কৌশল: উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দিয়ে পর্যটন ভিসায় রাশিয়ায় নেওয়া হচ্ছে।

  • জোরপূর্বক নিয়োগ: পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট জিম্মি করে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই করানো হচ্ছে।

  • বিপজ্জনক অবস্থান: কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ইউক্রেনের সবচেয়ে উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।

  • যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন: যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা অনেক বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের পরিবারগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।

  • আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নেপাল ও ভারত সরকার কড়া প্রতিবাদ জানালেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার