খাদ্যের আরও মূল্যবৃদ্ধি ঘটার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে চলমান চরম সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস চেইনের নজিরবিহীন বিপর্যয়ের কারণে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই ভীতিজনক সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে আকস্মিক খরা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গম, চাল, ভুট্টা ও ভোজ্যতেলের মতো অতি-প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের উৎপাদন স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। এই চরম ঘাটতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারকে মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল করে তোলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনিক পুষ্টির চাহিদাকে এক বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের মূল হাইলাইটস ও তথ্যসমূহ:
-
- তীব্র উৎপাদন ঘাটতি: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এশিয়া ও আমেরিকার প্রধান শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
- জ্বালানি ও সার সংকট: আন্তর্জাতিক বাজারে রাসায়নিক সার এবং জ্বালানি তেলের চড়া দামের কারণে কৃষি উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি।
- সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়: প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি।
- দরিদ্র দেশগুলোর ঝুঁকি: আমদানি-নির্ভর ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোতে তীব্র খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষের নতুন পদধ্বনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কামড় ও বিশ্বজুড়ে শস্য উৎপাদন হ্রাস
বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো স্থিতিশীল আবহাওয়া, যা সাম্প্রতিক সময়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এল নিনোর বৈরী প্রভাব এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী খরার কারণে এবার বিশ্বের অন্যতম প্রধান গমের আড়ত হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়া ও ইউক্রেনে উৎপাদন এক ধাক্কায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। বৈশ্বিক এই ধাক্কার কারণে উন্নত দেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ মজুত ধরে রাখতে রপ্তানি সীমিত করার নীতি গ্রহণ করছে, যা বিশ্ববাজারে বড় ধরণের শূন্যতা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, এশিয়ার প্রধান চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে অনিয়মিত বর্ষা এবং অসময়ের বন্যার কারণে ধানের ফলন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই সামগ্রিক ঘাটতি আন্তর্জাতিক পাইকারি বাজারে খাদ্যশস্যের দামকে প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী করে তুলছে। ফলে আমদানিকারক দেশগুলোকে এখন দ্বিগুণ অর্থ খরচ করে সীমিত পরিমাণ খাদ্য কিনতে হচ্ছে, যা পুরো বিশ্বজুড়ে খাদ্যের আরও মূল্যবৃদ্ধির পথকে আরও বেশি প্রশস্ত ও অনিবার্য করে তুলেছে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি
করোনা-পরবর্তী ধকল সামলে ওঠার আগেই ইউরেশীয় অঞ্চলে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং লোহিত সাগরে মালবাহী জাহাজের ওপর ক্রমাগত আক্রমণের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। জাহাজগুলোকে এখন আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যার ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ এবং সময় উভয়ই দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কন্টেইনার সংকটের কারণে বন্দরগুলোতে দিনের পর দিন পচনশীল খাদ্যপণ্য আটকে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
এই লজিস্টিকস জটিলতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক কমোডিটি ট্রেডার এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিম উপায়ে বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখাচ্ছে। তারা বিপুল পরিমাণ শস্য গুদামজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে দাম আরও চড়া করা যায়। এই ধরণের অনৈতিক ফায়দা লোটার মানসিকতা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটার জন্য সরাসরি দায়ী এবং এর ফলেই বিশ্ববাজারে খাদ্যের আরও মূল্যবৃদ্ধির গ্রাফ কোনোভাবেই নামানো যাচ্ছে না।
সার ও জ্বালানির চড়া দাম এবং কৃষকের মাথায় হাত
ফসলের ভালো ফলনের জন্য রাসায়নিক সার ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম চড়া থাকায় ইউরিয়া ও পটাশ সারের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সাধারণ কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সার ব্যবহার করতে না পারায় হেক্টর প্রতি ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।
ডিজেল এবং অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির দাম চড়া থাকার কারণে সেচ পাম্প চালানো এবং জমি চাষের খরচও আকাশচুম্বী। প্রান্তিক কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে এক স্থায়ী অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রক্ষাকবচ হিসেবে নিজস্ব মজুত ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ
আন্তর্জাতিক বাজারের এই ভয়াবহ মন্দা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে প্রতিটি দেশকে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদী দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। একই সাথে দেশের প্রধান ডাম্পিং ও স্টোরেজ সাইটগুলোতে সরকারিভাবে খাদ্যশস্যের বাফার স্টক বা জরুরি মজুত বহুগুণ বাড়াতে হবে।
সরকারকে ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে যাতে সমাজের নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ এই বিশ্বব্যাপী মূল্যের ঝড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে না যায়। আন্তর্জাতিক এই সংকটময় মুহূর্তে সঠিক বাজার মনিটরিং এবং অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখাই হবে যেকোনো দেশের অর্থনীতির প্রধান রক্ষাকবচ।