ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রধানমন্ত্রী শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীর শুভলগ্নে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সমগ্র দেশবাসীকে উৎসবের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঐতিহাসিক এই জাতীয় মন্দিরে আয়োজিত বিশেষ শুভেচ্ছা বিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আমাদের সামনে এক বৈষম্যহীন ও সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সব ধর্মের মানুষের মেলবন্ধন অত্যন্ত জরুরি। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী যেন ধর্মের নামে দেশে কোনো কৃত্রিম বিভেদ বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে কঠোরভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান।
এক নজরে প্রধানমন্ত্রীর মন্দির পরিদর্শনের মূল হাইলাইটস:
-
- ঐতিহাসিক বাণী: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার এবং রাষ্ট্র সবার—এই মূল চেতনা ধারণের প্রত্যয়।
- নিরাপত্তা ব্যবস্থা: দেশের প্রতিটি পূজা মণ্ডপে নির্বিঘ্ন ও ভীতিহীন পরিবেশে উৎসব উদযাপনে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি।
- সমন্বিত উন্নয়ন: কোনো বৈষম্য ছাড়াই দেশের প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা।
- পূজা পরিষদের প্রশংসা: কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও চমৎকার শৃঙ্খলার সাথে সারাদেশে পূজা আয়োজন করায় আয়োজকদের ধন্যবাদ।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রধানমন্ত্রী ও সম্প্রীতির নতুন রূপরেখা
রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় ঢাকেশ্বরী মেলাঙ্গনে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তাকে ফুলেল অভ্যর্থনা জানান। মন্দির প্রাঙ্গণে মণ্ডপ পরিদর্শনের পর তিনি সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও ভক্তদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ভাষণ দেন। তিনি বলেন, বহু ধর্মের ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই হলো বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য এবং শক্তির মূল উৎস। এই সুন্দর আবহকে অক্ষুণ্ণ রাখতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার এই ঘটনাটি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তার আবহ তৈরি করেছে।
বিগত কয়েক মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সংস্কারের পর এবারের দুর্গাপূজা নিয়ে এক ধরণের কৃত্রিম শঙ্কা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সরকারের নেওয়া নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথের কঠোর নজরদারি সেই সমস্ত অপচেষ্টাকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছে। সরকারপ্রধান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, এই দেশের মাটিতে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্র সবার জানমালের নিরাপত্তা দিতে আইনিভাবে সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ।
বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে প্রতিটি নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ জরুরি
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন। তিনি বলেন, একটি সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র কখনো তার নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করতে পারে না। আমরা এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছি যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে প্রধান মাপকাঠি এবং প্রতিটি ধর্মের মানুষ সমান প্রশাসনিক ও আইনি সুরক্ষা ভোগ করবে।
প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, পূজার পর বিসর্জন অনুষ্ঠান পর্যন্ত যেন কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা বা উস্কানিমূলক তৎপরতা মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে। মণ্ডপ পাহারায় নিয়োজিত পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন তরুণদের সমন্বিত কমিটিকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
পূজা উদযাপন পরিষদের দাবি ও সরকারের ইতিবাচক সাড়া
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি তাদের দীর্ঘদিনের কিছু নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের দাবি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। এর মধ্যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং একটি স্বাধীন সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী তাদের এই দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শোনেন এবং আশ্বাস দেন যে, একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে যা যা আইনি সংস্কার প্রয়োজন, সরকার তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেক অপরাধী পার পেয়ে গেছে, কিন্তু বর্তমান প্রশাসন প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আলাদা করে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ পাহারার প্রয়োজনই পড়বে না।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন ঐতিহ্যের জয়
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শারদীয় উৎসব কেবল কোনো একটি বিশেষ ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বাঙালির এক সর্বজনীন সামাজিক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলে এই আনন্দের ভাগীদার হওয়াটাই আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য।
জাতীয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সরকারপ্রধানের এই সময়োপযোগী ও জোরালো বক্তব্য দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে এক বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। উৎসবের আলো যেন প্রতিটি নাগরিকের অন্তরের অন্ধকার দূর করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সহনশীলতার পথ দেখায়, সেই প্রত্যাশা নিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।