যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান স্নায়ুযুদ্ধ: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কি তবে নতুন সংঘাতের পূর্বাভাস?
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈরী দুই পক্ষ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—আবারও এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। দুই দেশের মধ্যে কার্যকর থাকা তিন সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোঠায়। আলোচনার টেবিলে পাল্টাপাল্টি শর্ত আর আস্থার চরম সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কূটনৈতিক সব প্রচেষ্টা।
গত ২১ দিন ধরে বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত না ঘটলেও এই ‘শান্তি’ আদতে কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বজুড়ে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পর্দার আড়ালের আলোচনা এখন এক গভীর অচলাবস্থায় নিমজ্জিত। তেহরান তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের গণমাধ্যম ও রাজনীতি বিষয়ক প্রখ্যাত অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি এই পরিস্থিতিকে ‘এক জটিল গোলকধাঁধা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, দুই দেশের চাহিদার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকায় আলোচনার সম্ভাবনা এক গভীর খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে। এলমাসরি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যখন কূটনৈতিক জানালা বন্ধ হয়ে যায়, তখন রণহুঙ্কার আবারও জোরালো হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এই তিন সপ্তাহের সাময়িক বিরতিকে বিশ্লেষকরা দেখেছিলেন একটি বড় অর্জনের সোপান হিসেবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সমীকরণ বলছে ভিন্ন কথা। হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরান তাদের ছায়া গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিপরীতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব মনে করছে, ওয়াশিংটন বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করছে না।
এই ভিন্নমুখী অবস্থানের কারণে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোও এখন পিছু হটতে শুরু করেছে। কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলো যারা দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছিল, তারাও এখন আলোচনার টেবিলে কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছে না। এই অচলাবস্থা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে তেলের দাম থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতিটি স্তরে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যখনই আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়েছে, তখনই তার মাশুল দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। বর্তমান এই স্থবিরতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে সাময়িক এই যুদ্ধবিরতি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্থায়ী শান্তি নাকি প্রচ্ছন্ন যুদ্ধ—কোন দিকে মোড় নেবে এই সংকট, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। তবে বাস্তববাদী কূটনীতিকদের মতে, কেবল ৩ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বিদ্বেষ মোচন করা অসম্ভব।





