বিষধর সাপের ছোবল থেকে ৩০ শিশুকে বাঁচিয়ে বিদায় নিলো পথের কুকুর
ত্রাতা হিসেবে দেবদূত আসে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; তবে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার ধিরাকুলা গ্রামে গত সপ্তাহে যা ঘটল, তা রূপকথাকেও হার মানায়। নিজের জীবনের বিনিময়ে ৩০ জন স্কুলপড়ুয়া শিশুর প্রাণ বাঁচিয়ে এক অনন্য বীরত্বের নজির গড়ল ‘কালী’ নামের একটি অবলা পথের কুকুর।
ঘটনাটি গত সপ্তাহের শুরুর দিকের। প্রতিদিনের মতোই ময়ূরভঞ্জ জেলার ‘শ্রী জগন্নাথ শিশু বিদ্যা মন্দির’-এর প্রাঙ্গণ মুখরিত ছিল শিশুদের কলকাকলিতে। কিন্ডারগার্টেনের প্রায় ৩০ জন শিশু স্কুলের সামনের খোলা জায়গায় বসে খেলায় মত্ত ছিল। সময়টা তখন সকাল সাড়ে ৮টা। চারদিকে প্রশান্তিময় পরিবেশ, কিন্তু ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সাক্ষাৎ যমদূত।
গ্রামবাসীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হঠাৎ করেই একটি বড় ও প্রচণ্ড বিষধর সাপ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শিশুদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। কৌতূহলী শিশুরা সাপটির উপস্থিতি টেরও পায়নি। ঠিক যখন বড় কোনো অঘটন ঘটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র, তখনই দৃশ্যে আবির্ভূত হয় ওই এলাকার অতি পরিচিত পথকুকুর ‘কালী’।
কালী বুঝতে পেরেছিল সামনে বিপদ। এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে সে শিশুদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ফণা তোলা বিষধর সাপের চোখের দিকে তাকিয়ে নির্ভীক কালী ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রু বিনাশে। শুরু হয় এক অসম লড়াই। একদিকে সাপের বিষাক্ত ছোবল, অন্যদিকে কালীর দাঁত ও নখ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাপটি বেশ কয়েকবার কালীর মুখে ও শরীরে আঘাত করে। কিন্তু মৃত্যুযন্ত্রণা উপেক্ষা করে কালী সাপটিকে কামড়ে ধরে শিশুদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে থাকে। প্রায় দশ মিনিটের সেই রক্তক্ষয়ী লড়াই শেষে সাপটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে সাপের মরণ-ছোবলে কালীর শরীরে বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল। সাপটিকে নিস্তেজ করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শিশুদের নিরাপদ রেখে নিথর হয়ে পড়ে বীর কালী।
কালীর এই আত্মত্যাগ ধিরাকুলা গ্রামকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। যে শিশুরা একটু আগে হাসিখুশি খেলছিল, তাদের অভিভাবকরা এসে যখন বিষয়টি দেখেন, তখন সবার চোখে ছিল জল। স্কুলের এক শিক্ষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমরা সচরাচর কুকুরদের তাড়িয়ে দিই, কিন্তু আজ এই অবলা প্রাণীটি না থাকলে ৩০টি পরিবারের কোল খালি হয়ে যেত। কালী আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, ভালোবাসা আর আনুগত্যের কোনো ভাষা নেই।”
গ্রামবাসীরা কালীর মৃতদেহটি পরম মমতায় উদ্ধার করেন এবং মর্যাদার সাথে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। অনেকে তার কবরের ওপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কালীর এই বীরত্বগাথা এখন ভাইরাল, যা পশুপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে।





