টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা, পানিবন্দি লাখো মানুষ
অবিরাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও উপকূলীয় অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বহু এলাকায় নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নতুন নতুন জনপদ প্লাবিত হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও দেখা দিয়েছে পাহাড়ধসের আশঙ্কা, কোথাও আবার জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সংকট তীব্র
কক্সবাজারে কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন রোহিঙ্গা, আহত হয়েছেন আরও ১৮ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি মানুষ এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে চার হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি দুর্যোগে ক্যাম্পগুলোতে ইতোমধ্যে ২৮৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ভূমিধস, ঝোড়ো বাতাস ও আকস্মিক বন্যার ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। হাজার হাজার আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনে কাজ করছে।
জেলায় জেলায় বন্যার বিস্তার
কক্সবাজারের অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রায় ছয় লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। গত চার দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও পাহাড়ধসে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ও নৌ চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে দুই বোনের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া ফেলেছে।
চট্টগ্রামে দুর্ভোগ চরমে
চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশসহ কয়েকটি উপজেলায় বন্যার পানি ঢুকে লাখো মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত তিন দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নারী-শিশুসহ আটজন প্রাণ হারিয়েছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর একাধিক পয়েন্টে পানি এখনও বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।
মৌলভীবাজারে বাঁধ ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত
রাজনগরের উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। বন্যার পানিতে ডুবে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কমলগঞ্জেও পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে।
খুলনায় জলাবদ্ধতা, সিলেটে নদীর পানি বৃদ্ধি
খুলনায় টানা বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় হাঁটুপানি জমেছে। ড্রেনের নোংরা পানি ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
সিলেটে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও উজানের ঢলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কয়েকটি পয়েন্টে পানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
পাহাড়ি জেলাগুলোতেও বিপর্যয়
রাঙামাটিতে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, কৃষিজমি ও খামার পানির নিচে চলে গেছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে বান্দরবানে পানি নামতে শুরু করলেও বহু মানুষ এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। দুর্গতদের জন্য খাদ্যশস্য বরাদ্দ দিয়েছে সরকার এবং প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যান্য জেলাতেও দুর্ভোগ
নাটোরে আত্রাই নদীর শহররক্ষা বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ভোলায় দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিতে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে খাদ্যসংকটে পড়েছে। সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। চুয়াডাঙ্গা, কলাপাড়া, নেত্রকোনা ও নীলফামারীতেও ভারী বৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধিতে জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে।
উদ্ধারে মাঠে সেনাবাহিনী
চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের অনুরোধে ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়েছেন।
আইএসপিআর জানিয়েছে, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সেনাসদস্যরা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন। দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য কয়েকটি অস্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দুর্গত মানুষের পাশে থেকে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।





