জাতীয় ফিচার

পরিবেশ রক্ষায় নীতি সংস্কারের দাবি তুললেন উপদেষ্টা ফরিদা

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বন কেটে চিংড়ি ঘের তৈরির বিরোধিতা করে কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে চিংড়ি চাষ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব উপায়ে এই বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল সংরক্ষণ করে কীভাবে টেকসই চাষ সম্ভব, তা নিশ্চিত করতে হবে।” এই বন উপকূলীয় এলাকায় ঝড়-ঝাপটা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করে, যা বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশের জন্য অপরিহার্য।

গতকাল বুধবার রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘ট্রান্সফর্মিং পলিসি সাপোর্ট ফর রিভাইভিং বাংলাদেশ’স শ্রিম্প সেক্টর’ শীর্ষক নীতি সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই সংলাপে চিংড়ি খাতের পুনরুজ্জীবনের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়, যেখানে রপ্তানিকারকরা শিল্প খাতের মতো প্রণোদনা দাবি করেন।

উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, চিংড়িতে জেলি ব্যবহারসহ নানা অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা। নব্বইয়ের দশকে চিংড়ি রপ্তানি দেশের অন্যতম আয়ের উৎস ছিল, কিন্তু এখন এটি অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে বাস্তব তথ্য সংগ্রহের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “মাঠের বাস্তবতা না জেনে সঠিক নীতি নির্ধারণ অসম্ভব। জাতীয় মৎস্য নীতিমালা ২০২৫-এ এসব বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে পশু খাদ্য এবং মৎস্য খাদ্যের মধ্যে কোনো মিশ্রণ না হয়।”

সামুদ্রিক মাছের মজুত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত আহরণের (IUU ফিশিং) ফলে গত সাত বছরে সাগরে মাছের মজুত ৭৮ শতাংশ কমেছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অবৈধ জালের ব্যবহারও বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “শুধু অবৈধ জাল ধ্বংস করলেই হবে না, জাল উৎপাদনের উপকরণ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।”

মৎস্য খাতের বিদ্যুৎ বিলের বৈষম্য নিয়ে তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদনকারী এই খাতকে শিল্প শ্রেণির মতো উচ্চ হারে বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়, যা অন্যায়। “এক বছর ধরে এ সমস্যার সমাধানে কাজ চলছে। আশা করছি, শিগগিরই বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে।” সুদের হার কমানো এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কাছে একটি বিশেষায়িত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রযুক্তি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে জোর দিয়ে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যেতে পারবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “এটি কোনো সাব-সেক্টর নয়, পূর্ণ সেক্টর। আন্তঃমন্ত্রণালয়িক বৈষম্য দূর করতে ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে।” মৎস্যজীবীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মাছের ধরণ অনুসারে তাদের চিহ্নিত করে সহায়তা প্রদানের উপর জোর দেন।

বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এ খাতে অর্থায়নই একমাত্র সমাধান নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই মূল চ্যালেঞ্জ। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।” অনুষ্ঠানে রপ্তানিকারকরা বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড়, নগদ অর্থ সহায়তা এবং তহবিল গঠনের দাবি তুলে ধরেন, যাতে চিংড়ি খাত পুনরায় রপ্তানির অন্যতম শীর্ষ খাত হয়ে ওঠে।

ফরিদা আখতার, যিনি অর্থনীতিবিদ এবং অধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিত, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এই দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় দেশীয় প্রজাতির প্রাণী সম্পদ সংরক্ষণ এবং খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র