“পাট খাতের ভুলের পুনরাবৃত্তি বস্ত্র খাতে হবে না”
বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন পাট শিল্পের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বস্ত্র খাতকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পাটে যে অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, সেই ভুল বস্ত্রে পুনরাবৃত্তি হবে না। আমরা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেব না, বাস্তবতার নিরিখে এগোব।” এই খাতকে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি করে তোলার লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উপর জোর দেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার ‘জাতীয় বস্ত্র দিবস-২০২৫’ উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে (জেডিপিসি) আয়োজিত ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রেইনভেনশন: ক্রিয়েটিং স্কিল্ড প্রফেশনালস ফর দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল সেক্টর অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বস্ত্র শিল্পের প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বস্ত্র ও পাট সচিব বিলকিস জাহান রিমি।
উপদেষ্টা বলেন, বস্ত্র খাত এখন শুধু শিল্প নয়, দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি অর্জন করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮.৩ শতাংশ বৃদ্ধি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ৮৩ শতাংশ নির্ভরতা থাকলেও, লাতিন আমেরিকা ও জাপানের মতো নতুন বাজারে প্রবেশ করে বৈচিত্র্য আনতে হবে। তিনি বলেন, “১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনে শিল্প, একাডেমিয়া ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয় জরুরি। সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে বিশ্ববাজারে পিছিয়ে পড়ব।”
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উপর বিশেষ জোর দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েল আছে, আমাদের ১৮ কোটি মানবসম্পদ। এই সম্পদকে দক্ষ করে তুললে বস্ত্রশিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।” সরকার ইতোমধ্যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছে, যাতে গ্রিন ফ্যাক্টরি (এলইডি সার্টিফাইড) সংখ্যা ২৩৭-এ পৌঁছেছে। এছাড়া, ম্যানমেড ফাইবার (এমএমএফ) ভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পলিসি সাপোর্ট এবং স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি তুলেছেন শিল্পনেতারা। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশনের পর ৭.৭৭ বিলিয়ন ডলারের প্রেফারেনশিয়াল অ্যাক্সেস হারানোর চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, পলিটিক্যাল স্ট্যাবিলিটি এবং ইনভেস্টমেন্ট বাড়ালে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে বিশ্বাস প্রকাশ করেন।
পাট খাতের পুনরুজ্জীবন নিয়েও তিনি আশাবাদী। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগকে প্রমোট করতে জলবায়ু ফান্ডের আওতায় ১,৬০০-এর বেশি উদ্যোক্তার জন্য রিভলভিং ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যা সাশ্রয়ী মূল্যে পাটপণ্য সরবরাহ করছে। আসন্ন বাণিজ্য মেলায় ১০ লাখ পাটের ব্যাগ বিক্রির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকার পাটের বৈচিত্র্যায়নকে ত্বরান্বিত করছে—জুট ইয়ার্ন, কম্পোজিট, ফার্নিচার, পেপার এবং অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রির জন্য হাই-কোয়ালিটি ফ্যাব্রিক তৈরিতে জোর দিয়ে। ২০২৫-৪০ এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বার্ষিক ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি থেকে আরও বাড়ানোর লক্ষ্য, যাতে কৃষকদের আয় বাড়ে এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের গ্লোবাল ডিমান্ড কাজে লাগানো যায়। বিজিএমসি-এর অধীনে বন্ধ পড়া মিলগুলো পুনরায় চালু করতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ (বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন) প্রেসিডেন্ট ফারুক হোসেনসহ শিল্পনেতা ও একাডেমিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা দক্ষতা উন্নয়ন এবং পলিসি সহায়তার উপর জোর দিয়ে সেক্টরের টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করার আহ্বান জানান। শেখ বশিরউদ্দীন, যিনি সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের পর এই দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন, বলেন, “নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বস্ত্র খাতের ভূমিকা অপরিসীম—এটাকে সমৃদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”





