কেনিয়ার বিরল ‘দানব’ পিঁপড়ার পাচার ঘিরে ঘনীভূত রহস্য
কেনিয়ার প্রকৃতি থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে পূর্ব আফ্রিকার গর্ব ‘জায়ান্ট আফ্রিকান হারভেস্টার’ বা বিরল প্রজাতির মেসর সেফালোটেস পিঁপড়া। এশিয়া ও ইউরোপের অভিজাত বাজারে বিদেশি পোষা প্রাণী হিসেবে এই পিঁপড়ার অস্বাভাবিক চাহিদা বাড়ায় নাইরোবি এখন আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, যা দেশটির জৈব নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণত হাতির দাঁত বা গণ্ডারের শিং নিয়ে কেনিয়ার বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য শোনা গেলেও, এবার সবার নজর কেড়েছে খুদে এই প্রাণিকুল। আকারে বড় এবং শিকার ধরার বিশেষ কৌশলের কারণে আন্তর্জাতিক ‘এক্সোটিক পেট’ বা বিদেশি পোষা প্রাণীর বাজারে ‘মেসর সেফালোটেস’ (Messor cephalotes) প্রজাতির পিঁপড়ার কদর আকাশচুম্বী। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে একদল আন্তর্জাতিক কালোবাজারি।
পাচারকারীরা এই পিঁপড়াগুলোকে অত্যন্ত অমানবিক ও কৌশলী পদ্ধতিতে নাইরোবি থেকে সীমান্ত পার করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তারা বিশেষ ধরনের সিরিঞ্জ, প্লাস্টিক টিউব এবং বায়ুরোধী ছোট কন্টেইনার ব্যবহার করছে। মূলত চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপের শৌখিন সংগ্রাহকদের কাছে এগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সম্পূর্ণ পিঁপড়া কলোনি বা একটি ‘কুইন অ্যান্ট’ (রানি পিঁপড়া) পাচার করতে পারলে পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক বাজারে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়।
সম্প্রতি নাইরোবির একটি আদালতে পাচারকারী চক্রের এক বড় হোতাকে সাজা প্রদানের মাধ্যমে এই চক্রের ভয়াবহতা সামনে এসেছে। চীনা নাগরিক ঝ্যাং কেকুনকে সম্প্রতি কেনিয়ার আদালত এক বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ কেনিয়ান শিলিং জরিমানা করেছে। গত মার্চ মাসে জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রুটিন তল্লাশির সময় ঝ্যাংয়ের লাগেজ থেকে উদ্ধার করা হয় ২,২০০টিরও বেশি জীবন্ত পিঁপড়া।
তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই বিশাল পরিমাণ পিঁপড়ার মধ্যে ১,৯৪৮টিই ছিল বিরল মেসর সেফালোটেস। ঝ্যাং এই পিঁপড়াগুলো স্থানীয় এক কেনীয় নাগরিক চার্লস মুয়াঙ্গির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে লাখ টাকা মূল্যে বিক্রয়যোগ্য এই পিঁপড়াগুলো কেনিয়ার স্থানীয় বাজার থেকে মাত্র ১০০ শিলিং (প্রায় বাংলাদেশি ৮০-৯০ টাকা) দরে কেনা হয়েছিল। মুয়াঙ্গি বর্তমানে জামিনে থাকলেও তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে।
কেনিয়ার পিঁপড়া পাচার নিয়ে কিছু উদ্বেগজনক তথ্য:
-
পাচারের লক্ষ্য: মূল গন্তব্য এশিয়া ও ইউরোপের ‘এক্সোটিক পেট’ মার্কেট।
-
উদ্ধারকৃত সংখ্যা: এক অভিযানেই ২,২০০টির বেশি পিঁপড়া উদ্ধার, যা বড় সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত দেয়।
-
ব্যবহৃত সরঞ্জাম: শনাক্তকরণ এড়াতে সিরিঞ্জ ও বিশেষ টিউবে ভরে পাচার।
-
পরিবেশগত ঝুঁকি: বিরল প্রজাতির এই অপসারণ স্থানীয় বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
-
নিরাপত্তা শঙ্কা: কোনো পরীক্ষা ছাড়াই জীবন্ত পতঙ্গ অন্য দেশে প্রবেশ করলে মারাত্মক ‘বায়ো-ইনভেসন’ বা জৈব আগ্রাসনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র পতঙ্গ পাচারের এই ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার অবকাশ নেই বলে মনে করছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ পতঙ্গ সরিয়ে ফেললে সেখানকার মাটির উর্বরতা এবং বীজ বিস্তারের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তদুপরি, পাচার হওয়া এই পিঁপড়া যদি গন্তব্য দেশের পরিবেশে মিশে যায়, তবে তা সেখানকার স্থানীয় পতঙ্গদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কেনিয়ার আইনি ব্যবস্থার এই কঠোর অবস্থান অন্যান্য পাচারকারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে বিমানবন্দরের কার্গো ও হ্যান্ড লাগেজ স্ক্যানিংয়ে পতঙ্গ শনাক্তকরণের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
যদি এখনই এই ‘ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়ংকর’ পাচার রোধ করা না যায়, তবে কেনিয়ার জীববৈচিত্র্যের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে এই দানবীয় হারভেস্টার পিঁপড়া।
নাইরোবির এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, কালোবাজারিদের কাছে প্রাণীর আকার নয়, বরং তার চাহিদাই মুখ্য।





