ইতালিতে ভূমিকম্পের তাণ্ডব: একের পর এক ১২টি শক্তিশালী ঝাকুনি, জারি হলো সুনামি সতর্কতা
ইউরোপের অন্যতম সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত ইতালিতে ভূমিকম্প এর এক ভয়াবহ সিরিজ আঘাত হেনেছে, যার কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জারি করা হয়েছে জরুরি সুনামি সতর্কতা। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরের দিকে ইতালির পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত সিসিলি দ্বীপের উত্তর উপকূলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ১২টি শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো অঞ্চলজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং সম্ভাব্য সুনামির আশঙ্কায় উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সিসিলির সর্বশেষ পরিস্থিতি একনজরে:
• ইতালির সিসিলি উপকূল ও টিরেনিয়ান সাগরে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ১২টি ভূকম্পন রেকর্ড করেছে আইএনজিভি।
• মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) অনুসারে, সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৭।
• উপকূলীয় এলাকায় ঢেউয়ের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কায় জরুরি ‘অরেঞ্জ সুনামি অ্যালার্ট’ জারি করেছে দেশটির প্রশাসন।
• পালেরমো, মেসিনা ও ত্রাপানি শহরের সমস্ত স্কুল, আদালত এবং সরকারি ভবন থেকে দ্রুত মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সিসিলি উপকূলে ভূকম্পনের সিরিজ ও ভয়াবহ আতঙ্ক
ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ জিওফিজিক্স অ্যান্ড ভলক্যানোলজি (INGV) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ৩.৩ মাত্রার প্রথম মৃদু কম্পনটি অনুভূত হয়। এর ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো এলাকাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মূল ধাক্কাটি আসে, যার তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৫.০ থেকে ৫.৭ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল সিসিলির রাজধানী পালেরমো থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে টিরেনিয়ান সাগরের তলদেশে, ভূপৃষ্ঠ থেকে যার গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে পালেরমো, ক্যাটানিয়া, পাত্তি এবং লিপারি অঞ্চলের বহুতল ভবনগুলো তীব্রভাবে দুলতে শুরু করে। আতঙ্কে হাজার হাজার বাসিন্দা ও পর্যটক ঘরবাড়ি ও হোটেল ছেড়ে খোলা রাস্তায় নেমে আসেন। ইওলিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত ফিলিকুদি দ্বীপে একটি বিশালাকার পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
অরেঞ্জ সুনামি সতর্কতা ও গণ-উচ্ছেদ অভিযান
এই ভয়াবহ ইতালিতে ভূমিকম্প এর পরপরই ইতালীয় নাগরিক সুরক্ষা বিভাগ উপকূলবর্তী অঞ্চলে ‘অরেঞ্জ সুনামি সতর্কতা’ বা জরুরি পরামর্শ জারি করেছে। এই সতর্কতার অর্থ হলো, সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠে উপকূলীয় নিচু এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত উচ্চতার ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। যেকোনো ধরনের বড় বিপর্যয় এড়াতে পালেরমো এবং মেসিনা শহরের সমস্ত স্কুল ও কলেজ তাৎক্ষণিকভাবে ছুটি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে পাঠানো হয়েছে।
ত্রাপানি শহরের প্রধান আদালত ভবন এবং বেশ কিছু মিউনিসিপ্যাল কার্যালয় খালি করে দেওয়া হয়েছে। পালেরমোর মেয়র রবার্তো লাগাল্লা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে নাগরিকদের সমুদ্র সৈকত থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও ক্ষয়ক্ষতির অনুসন্ধান
ইতালির এই সিসিলি অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী প্রবাসী বসবাস করেন, যারা মূলত কৃষি, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত। আচমকা একের পর এক ভূমিকম্পের কারণে প্রবাসীদের মধ্যেও তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেক প্রবাসী জানিয়েছেন, দফায় দফায় আফটারশক হতে থাকায় তারা ভয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
আঞ্চলিক কোস্টগার্ড এবং পুলিশ বাহিনী ইতিমধ্যে সমুদ্র তীরবর্তী সমস্ত নৌযানকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের কাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ বা মানুষের হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ভূবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা এই অঞ্চলে আরও অনুকম্পন (Aftershocks) হতে পারে, যা সুনামির ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।




