হাম ও উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৭ প্রাণহানি, আক্রান্ত হাজারো শিশু
দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে সন্দেহে সারা দেশে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩০২ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী হার জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সোমবার (৪ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল এবং টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের তীব্রতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ ৪ মে পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৭৯৩ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৪৬৭ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে কয়েকশ নতুন রোগী হাসপাতালের দুয়ারে কড়া নাড়ছেন। চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা থাকায় এই রোগটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
কেন বাড়ছে প্রকোপ?
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টিকাদানে অনীহা এবং সচেতনতার অভাবই এই সংকটের মূলে। সাধারণত শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেওয়া হয়। তবে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই টিকাদানের হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম কেবল একটি সাধারণ চর্মরোগ বা জ্বর নয়। সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক পুষ্টির অভাব হলে এটি নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এমনকি অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা। অনেক ক্ষেত্রে আইসোলেশন বেডের অভাবে সাধারণ ওয়ার্ডেই হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা অন্যান্য রোগীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বর্তমান পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংক্রমণের ভয়াবহতা এক নজরে নিচে তুলে ধরা হলো:
-
২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু: ১৭ জন (হাম ও সন্দেহভাজন)।
-
এক দিনে নতুন সন্দেহভাজন রোগী: ১,৩০২ জন।
-
সর্বমোট সন্দেহভাজন রোগী (১৫ মার্চ – ৪ মে): ৪১,৭৯৩ জন।
-
এক দিনে নিশ্চিত হামরোগী: ১৫৪ জন।
-
সর্বমোট নিশ্চিত হামরোগী (১৫ মার্চ – ৪ মে): ৫,৪৬৭ জন।
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুল সংখ্যক প্রাণহানি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে এবং টিকা না নেওয়া শিশুদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কেবল সরকারি উদ্যোগে এই সংকট মেটানো সম্ভব নয়। অভিভাবকদের প্রতি চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো— শিশুর গায়ে র্যাশ বা লালচে দানা ওঠার সাথে সাথে জ্বর থাকলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। এছাড়া, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
হামের এই পুনরুত্থান আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা না হলে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান।





