হার্ট ভালো রাখতে কি সবার জন্য অ্যাসপিরিন?
হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে এক সময় মনে করা হতো ‘অ্যাসপিরিন’ এক জাদুকরী দাওয়াই। কিন্তু বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। হার্ট অ্যাটাক হয়নি এমন ব্যক্তিদের প্রতিদিন স্বল্প মাত্রার অ্যাসপিরিন সেবন উপকারের চেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই প্রবণতা এখন প্রাণঘাতী ঝুঁকির নাম।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, বয়স ৪০ বা ৫০ পার হলেই রক্ত পাতলা রাখার জন্য নিয়মিত একটি করে অ্যাসপিরিন খাওয়া জরুরি। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে, তারা একে হার্টের ‘সুরক্ষাকবচ’ মনে করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং কার্ডিওলজিস্টদের মতে, সুস্থ মানুষের জন্য এই নিয়মিত সেবন অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা ইন্টারনাল ব্লিডিংয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অ্যাসপিরিন মূলত প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার কার্যকারিতা কমিয়ে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। এটি তাদের জন্য অপরিহার্য যাদের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বা হার্টে রিং পরানো হয়েছে। কিন্তু যাদের কোনোদিন হার্টের সমস্যা হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে শরীর এই ওষুধের বাড়তি ধকল সইতে পারে না। সুস্থ রক্তনালীতে জোর করে রক্ত পাতলা করার চেষ্টা করলে পাকস্থলী বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।
কেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়?
অ্যাসপিরিন কেবল একটি সাধারণ ব্যথানাশক বা জ্বর কমানোর ওষুধ নয়; এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-প্লাটিলেট ড্রাগ। একজন প্রবীণ সাংবাদিক হিসেবে গত ১৫ বছরের চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্টগুলোতে দেখেছি, অনেকেই কেবল পাশের বাড়ির লোক খাচ্ছে বলে নিজে ওষুধটি শুরু করেন। চিকিৎসকদের মতে, অ্যাসপিরিন শুরুর আগে রোগীর বয়স, লিঙ্গ, ওজন এবং পূর্ববর্তী কোনো আলসার বা রক্তক্ষরণের ইতিহাস আছে কি না, তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সী সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসকরা এখন নিয়মিত অ্যাসপিরিন সেবনের ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করছেন। তাদের মতে, বার্ধক্যের কারণে রক্তনালী এমনিতেই কিছুটা দুর্বল থাকে, সেখানে এই ওষুধের প্রভাব হিতে বিপরীত হতে পারে।
জরুরি কিছু তথ্য ও সতর্কতা
অ্যাসপিরিন সেবনের আগে এবং পরে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি:
-
প্রাথমিক প্রতিরোধ: যাদের হৃদরোগ নেই, তাদের জন্য অ্যাসপিরিন ‘প্রাইমারি প্রিভেনশন’ হিসেবে এখন আর সমাদৃত নয়।
-
রক্তক্ষরণের ঝুঁকি: নিয়মিত সেবনে পাকস্থলীতে ঘা বা গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে রক্তপাত হতে পারে।
-
মস্তিষ্কে আঘাত: সামান্য পড়ে যাওয়া বা চোট থেকেও মস্তিষ্কে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ (হেমোরেজিক স্ট্রোক) হতে পারে যদি রক্ত অতিরিক্ত পাতলা থাকে।
-
ব্যতিক্রম: যাদের উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস অত্যন্ত প্রবল, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক খুব সতর্কতার সাথে এটি প্রেসক্রাইব করতে পারেন।
ওষুধের ওপর নির্ভর না করে হার্ট ভালো রাখার প্রাকৃতিক উপায়গুলোই এখন সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। দৈনিক ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, পাতে লবণের পরিমাণ কমানো, এবং ধূমপান বর্জন করা—এই তিনটি অভ্যাস একটি অ্যাসপিরিন ট্যাবলেটের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি সুরক্ষা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ মানুষের জন্য ‘জাদুকরী বড়ি’ বলে কিছু নেই। সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত ব্যায়ামই হলো দীর্ঘায়ুর আসল রহস্য।
পরিশেষে, অ্যাসপিরিন হৃদরোগীদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এটি ‘অযাচিত আপদ’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আপনার বয়স হয়েছে বলেই হার্ট ভালো রাখতে অ্যাসপিরিন খেতে হবে—এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।





