জাতীয় ফিচার রাজনীতি

ইশতেহারে ‘কথার ফুলঝুরি’: বড় দলগুলোর উচ্চাভিলাষ নিয়ে সুজনের কড়া সমালোচনা

ইশতেহারে ‘কথার ফুলঝুরি’: বড় দলগুলোর উচ্চাভিলাষ নিয়ে সুজনের কড়া সমালোচনা

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে স্রেফ ‘কথার ফুলঝুরি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি জানায়, প্রধান দলগুলোর ইশতেহার আকর্ষণীয় হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘কোন দলের কেমন ইশতেহার?’ শীর্ষক এই পর্যালোচনামূলক সংবাদ সম্মেলনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বড় দুই দলের ইশতেহারই অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী এবং গাণিতিক হিসাবের চেয়ে আবেগের ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলগুলো দারিদ্র্য বিমোচন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় ডিঙিয়ে কীভাবে এই বিশাল ব্যয়ের সংস্থান হবে, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা ইশতেহারগুলোতে অনুপস্থিত।

সুজনের মতে, ইশতেহারগুলো অনেকটা সুদৃশ্য মোড়কে ঢাকা স্বপ্নের মতো, যা কেবল ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা টেকসই, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।

প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসনের ঘাটতি

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দলগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর যতটা জোর দিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারে ততটাই উদাসীন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারগুলো বরাবরই অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। দলগুলো ক্ষমতার বাইরে থাকলে যেসব সংস্কারের কথা বলে, ক্ষমতায় গিয়ে সেগুলো ভুলে যাওয়ার একটি দীর্ঘ ইতিহাস বাংলাদেশে রয়েছে।

বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এসব ইশতেহার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিশেষ করে বড় দুই দলের মধ্যে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা, তা অনেক সময় অবাস্তব প্রতিশ্রুতির জন্ম দিচ্ছে।

সুজনের সংবাদ সম্মেলনের মূল পয়েন্টগুলো:

  • বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: ইশতেহারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় বিশাল অংকের অর্থের উৎস সম্পর্কে দলগুলোর কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই।

  • উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি: ৭ থেকে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘কঠিন বাস্তব’ হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।

  • বিপরীতমুখী অবস্থান: দলগুলোর অতীত কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে বিশাল ফারাক বিদ্যমান।

  • সুশাসনের অনুপস্থিতি: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে কোনো দলেই জোরালো অবস্থান নেই।

  • ফাঁকা বুলি: কর্মসংস্থানের সংখ্যা নিয়ে বড় দলগুলোর দেওয়া তথ্যকে উপাত্তের চেয়ে রাজনীতি হিসেবেই বেশি দেখছে সুজন।

সুজনের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, দলগুলো জনতুষ্টিবাদী (Populist) রাজনীতিতে বেশি আগ্রহী। ইশতেহারে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য অনেক বরাদ্দ ও সুবিধার কথা থাকলেও, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের কথা বলা হয়নি। ফলে গতানুগতিক দুর্নীতির বলয়ে এই বরাদ্দগুলো হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্টজনেরা মন্তব্য করেন, ইশতেহার কেবল নির্বাচনের আগের একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটারদের উচিত দলগুলোর এই প্রতিশ্রুতির ব্যবচ্ছেদ করা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। সুজন মনে করে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইশতেহার বাস্তবায়ন না করার জন্য কোনো আইনি বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি না হবে, ততক্ষণ দলগুলো এভাবে ‘কথার জাদুকরী’ দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই থাকবে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র