শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত
শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের নির্বাচনী সমীকরণ হঠাৎ করেই বিষাদে রূপ নিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নুরুজ্জামান বাদলের (৫১) আকস্মিক মৃত্যুতে থমকে গেছে পুরো নির্বাচনী মহাযজ্ঞ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় শেরপুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তরফদার মাহমুদুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পারিবারিক ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে নিজের বাসভবনে হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন নুরুজ্জামান বাদল। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে তাকে প্রথমে শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ স্বদেশ হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের মুখে ব্রিজ এলাকায় পৌঁছাতেই নিভে যায় এই রাজনীতিবিদের জীবনপ্রদীপ। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনিজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে শেরপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও নির্বাচন স্থগিতের নেপথ্যে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ১৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর এবং ভোটগ্রহণের আগে যদি কোনো ‘বৈধভাবে মনোনীত’ প্রার্থী মৃত্যুবরণ করেন, তবে ওই আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল বা স্থগিত করার বিধান রয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান জানান:
“আইন অনুযায়ী আমরা নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিতের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে এবং পরবর্তীতে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে।”
এই স্থগিতাদেশের ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের অন্যান্য আসনে ভোট হলেও শেরপুর-৩ আসনে ওইদিন কোনো নির্বাচন হচ্ছে না।
শোকাতুর শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী
নুরুজ্জামান বাদল কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, এলাকায় একজন সুবক্তা ও সংগঠক হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। তার মৃত্যুতে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আজ বুধবার বাদ জোহর শেরপুর পৌর ঈদগাহ মাঠে প্রথম জানাজা এবং বিকেলে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তাপের বদলে এখন সর্বত্রই শোকের আবহ। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নতুন তফসিল ঘোষিত হলে আবারও এই জনপদে ভোটের জোয়ার ফিরবে, তবে নুরুজ্জামান বাদলের অনুপস্থিতি আসন্ন লড়াইয়ের রসায়ন বদলে দিতে পারে বলেই মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
এক নজরে শেরপুর-৩ আসনের পরিস্থিতি:
-
প্রয়াত প্রার্থী: নুরুজ্জামান বাদল (৫১), সেক্রেটারি, জেলা জামায়াতে ইসলামী।
-
অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী: মাহমুদুল হক রুবেল (বিএনপি), মুফতি আবু তালেব মো. সাইফুদ্দিন (ইসলামী আন্দোলন), মো. মিজানুর রহমান (বাসদ-মার্কসবাদী) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিনুল ইসলাম বাদশা।
-
সাম্প্রতিক সহিংসতা: গত ২৮ জানুয়ারি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে উপজেলা জামায়াত নেতা রেজাউল করিমের মৃত্যুর পর এলাকাটি এমনিতেই উত্তপ্ত ছিল।
-
আইনি পদক্ষেপ: আরপিও ১৭(১) ধারা অনুযায়ী এখন নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হবে, তবে পুরনো বৈধ প্রার্থীদের পুনরায় জামানত বা নতুন মনোনয়ন দাখিল করতে হবে না।





