অন্যান্য ফিচার বিশ্ব সংযোগ

ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় লণ্ডভণ্ড জ্বালানি খাত, অন্ধকারে লাখো মানুষ

ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় লণ্ডভণ্ড জ্বালানি খাত, অন্ধকারে লাখো মানুষ

ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কিয়েভ, খারকিভ ও জাপোরিঝিয়াকে লক্ষ্য করে চালানো এই সমন্বিত হামলায় অন্তত ২ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও তাপহীন অবস্থায় চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ।

শীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের নতুন কৌশল

যুদ্ধের ময়দানে যখন পাল্টাপাল্টি আক্রমণ চলছে, তখন মস্কো পুনরায় ইউক্রেনের বেসামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। বুধবার ভোরে ইউক্রেনের আকাশসীমায় ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি নকশার ‘কামিকাজে’ ড্রোন প্রবেশ করে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সাব-স্টেশনগুলো। প্রচণ্ড ঠান্ডায় যখন হিটিং সিস্টেম সচল রাখা জীবনের জন্য অপরিহার্য, ঠিক তখনই এই আঘাত হানা হলো।

কিয়েভের মেয়র জানিয়েছেন, ড্রোনগুলো শহরের প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমারে আঘাত হেনেছে। এর ফলে রাজধানীর একটি বড় অংশ মুহূর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে যায়। খারকিভ এবং জাপোরিঝিয়ার অবস্থা আরও শোচনীয়। সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আগুনের লেলিহান শিখা রাতের আকাশকে লাল করে দিয়েছিল।

হিমাঙ্কের নিচে মানবিক হাহাকার

বর্তমানে ইউক্রেনের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অবস্থান করছে। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে কেবল অন্ধকার নয়, বরং জীবন-মৃত্যুর লড়াই। কেন্দ্রীয় হিটিং ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতরেই জমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিশেষ করে বৃদ্ধ এবং শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে, তবে জ্বালানি সংকটে সেই সেবাও কতক্ষণ সচল থাকবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কিয়েভের স্থানীয় বাসিন্দা ওলেনা বলেন, “রাশিয়া আমাদের ওপর কেবল বোমা ফেলছে না, তারা আমাদের জমিয়ে মারার চেষ্টা করছে।”

প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী দাবি করেছে যে তারা আগত ড্রোনগুলোর একটি বড় অংশ ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ড্রোনের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সফল হয়। জেলেনস্কি সরকার এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জরুরি জেনারেটর সহায়তা চেয়েছে।

অন্যদিকে, ক্রেমলিন বরাবরের মতোই দাবি করেছে যে তারা কেবল সামরিক এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে আঘাত হানছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, যেখানে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

রাশিয়ার এই সাম্প্রতিক হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বসন্ত আসার আগে তারা ইউক্রেনকে একটি বড় ধরণের মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে চায়। জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত করা সময়ের ব্যাপার, কিন্তু এই তীব্র শীতে প্রতিটি মুহূর্ত এখন মূল্যবান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে গোলার আঘাতের চেয়ে ঠান্ডাতেই প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এক নজরে হামলার ক্ষয়ক্ষতি ও বর্তমান চিত্র:

  • নিহত: ২ জন (কিয়েভ ও জাপোরিঝিয়া)।

  • আহত: ১৫ জন (যাদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক)।

  • আক্রান্ত শহর: কিয়েভ, খারকিভ, জাপোরিঝিয়া এবং ওডেসা।

  • তাপমাত্রা: মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

  • প্রভাব: প্রায় ১০ লাখ মানুষ বর্তমানে বিদ্যুৎ ও পানিহীন অবস্থায় রয়েছেন।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার