শিশু শিক্ষার্থীদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া, সঠিক তথ্যের অভাবে ক্ষোভ
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় শোকের মাতমে ডুবে গেছে গোটা দেশ। সোমবার দুপুরে হায়দার আলী অ্যাকাডেমিক ভবনের ছাদে বিমানটি আছড়ে পড়লে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৫ জনই ১২ বছরের কম বয়সী শিশু শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন আরও ৭৮ জন, যাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
মঙ্গলবার (২২ জুলাই) সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, “নিহতদের মধ্যে একজন পাইলট এবং একজন শিক্ষিকাও রয়েছেন। আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
ঘটনার পর থেকে মৃত ও আহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপতথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে মাইলস্টোনের শত শত শিক্ষার্থী গোলচত্বরে জমায়েত হয়ে ছয় দফা দাবি নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে নিহত ও আহতদের নির্ভুল তালিকা প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ প্রদান, এবং বিমানবাহিনীর ঝুঁকিপূর্ণ প্লেন বাতিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষার্থীরা বলছেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনার পরও কেউ দায় নিচ্ছে না।”
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জানান, বিমানটি যে ভবনে আঘাত হানে, সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস চলছিল। প্রতি ক্লাসে প্রায় ৩০ জন করে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। তবে কতজন শিক্ষার্থী ঘটনার সময় ভবনে ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি তিনি। “ক্লাস শেষে অনেক শিক্ষার্থী বেরিয়ে গিয়েছিল। হাজিরার খাতা থেকে সঠিক তথ্য এখনও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি,” বলেন বুলবুল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষার্থীদের সংখ্যার তথ্য চেয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি। একজন শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাইলস্টোনের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এত বড় ঘটনার পরও তথ্যের এই ঘাটতি দুঃখজনক।”
এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধান উপদেষ্টা, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। হাইকোর্ট নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি এবং আহতদের ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, এবং সেনাবাহিনী উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। আহতদের দ্রুত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বার্ন ইনস্টিটিউটে বর্তমানে ৪১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজন ভেন্টিলেশনে আছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু উত্তরার নয়, সারা দেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সঠিক তথ্য প্রকাশ ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।





