বেশি এসপিএফ মানেই কি নিশ্চিন্ত? সানস্ক্রিন বাছাইয়ে যে ভুল করে সবাই
তপ্ত রোদে বের হওয়ার আগে আমরা অনেকেই এখন সানস্ক্রিন ব্যবহার করি। কিন্তু বাজারে থাকা এসপিএফ (SPF) ৩০, ৫০ কিংবা ১০০-এর ভিড়ে আমরা কি সঠিক সুরক্ষাটি পাচ্ছি? এসপিএফ বেশি হলেই যে তা রোদের সব ক্ষতি থেকে ত্বক বাঁচাবে, এই প্রচলিত ধারণাটি আধুনিক চর্মরোগ বিজ্ঞানের মতে একটি বড় বিভ্রান্তি।
কেন শুধু এসপিএফ যথেষ্ট নয়?
সূর্য থেকে মূলত দুই ধরনের অতিবেগুনি রশ্মি আমাদের ত্বকে আঘাত হানে— ইউভিএ (UVA) এবং ইউভিবি (UVB)। এসপিএফ মূলত ইউভিবি রশ্মি থেকে সুরক্ষার একটি পরিমাপক, যা ত্বকে পোড়াভাব বা সানবার্ন রোধ করে। কিন্তু ইউভিএ রশ্মি, যা ত্বকের গভীরে গিয়ে অকাল বার্ধক্য, বলিরেখা এবং ডিএনএ-র ক্ষতি করে, তার জন্য শুধু উচ্চ এসপিএফ যথেষ্ট নয়।
বাজারে অনেক সানস্ক্রিন পাওয়া যায় যাতে এসপিএফ-এর মাত্রা অনেক বেশি থাকে, কিন্তু সেটি ‘ব্রড স্পেকট্রাম’ (Broad Spectrum) কি না, তা আমরা অনেকেই পরীক্ষা করি না। একজন সিনিয়র চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের মতে, “অনেকেই মনে করেন এসপিএফ ১০০ মাখলে সারাদিন রোদে থাকা যাবে। এটি একটি বিপজ্জনক ধারণা। এসপিএফ ৩০ যেখানে ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দেয়, সেখানে এসপিএফ ৫০ দেয় ৯৮ শতাংশ। মাত্র ১ শতাংশ পার্থক্যের জন্য আমরা অনেক সময় অতিরিক্ত রাসায়নিক সমৃদ্ধ পণ্য বেছে নিচ্ছি।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও ঝুঁকি
আমাদের দেশে মেলানিনের আধিক্যের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কিছুটা কম হলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের তীব্র তাপদাহ ও ওজোন স্তরের পরিবর্তনের ফলে ত্বকের সংবেদনশীলতা বাড়ছে। দীর্ঘ সময় সুরক্ষাহীনভাবে রোদে থাকার ফলে হাইপারপিগমেন্টেশন এবং মেছতার মতো সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোদে বের হওয়ার অন্তত ২০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন লাগানো উচিত। তবে শুধু মাখলেই হবে না, প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা অন্তর এটি পুনরায় ব্যবহার (Re-apply) করা জরুরি। কারণ ঘাম বা বাতাসের আর্দ্রতায় সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পায়।
সঠিক সানস্ক্রিন চেনার চাবিকাঠি
সানস্ক্রিন কেনার সময় বোতলের গায়ে কেবল এসপিএফ না দেখে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করা জরুরি:
-
ব্রড স্পেকট্রাম: এটি নিশ্চিত করে যে পণ্যটি ইউভিএ এবং ইউভিবি—উভয় রশ্মি থেকেই সুরক্ষা দেবে।
-
পিএ রেটিং (PA Rating): ইউভিএ রশ্মি থেকে সুরক্ষার মাত্রা বুঝতে PA+, PA++ বা PA+++ চিহ্নটি দেখুন। যত বেশি প্লাস চিহ্ন, সুরক্ষাও তত বেশি।
-
ত্বকের ধরন: তৈলাক্ত ত্বকের জন্য জেল বা একুয়া-বেজড এবং শুষ্ক ত্বকের জন্য ক্রিম-বেজড সানস্ক্রিন বেছে নিন।
-
পরিমাণ: অন্তত দুই আঙুল পরিমাণ (Two-finger rule) সানস্ক্রিন মুখ ও গলার জন্য ব্যবহার করা প্রয়োজন।
এক নজরে জরুরি কিছু তথ্য
-
ইউভিবি (UVB): এটি ত্বকের উপরিভাগ পুড়িয়ে দেয় এবং লালচে ভাব তৈরি করে।
-
ইউভিএ (UVA): এটি মেঘ বা জানলার কাঁচ ভেদ করতে পারে এবং ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী।
-
ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন: এতে জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড থাকে যা রোদকে আয়নার মতো প্রতিফলিত করে দেয়। সংবেদনশীল ত্বকের জন্য এটিই সেরা।
-
কেমিক্যাল সানস্ক্রিন: এটি রশ্মি শোষণ করে তা তাপে রূপান্তর করে শরীর থেকে বের করে দেয়।
সৌন্দর্য সচেতনতা আর স্বাস্থ্য সচেতনতা এক নয়। সানস্ক্রিন কেবল ফর্সা হওয়ার প্রসাধন নয়, বরং এটি একটি প্রতিরোধমূলক ওষুধ। এসপিএফ-এর সংখ্যার পেছনে না ছুটে সঠিক মান এবং নিয়মিত ব্যবহারের অভ্যাসই পারে আমাদের ত্বককে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।





