যান্ত্রিক জীবনের মহৌষধ: বিশ্বজুড়ে আজ উদযাপিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হাসি দিবস’
যান্ত্রিক সভ্যতার যাঁতাকলে পিষ্ট মানবজীবনের ক্লান্তি দূর করতে আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অকৃত্রিম হাসির সুর। মে মাসের প্রথম রবিবার হিসেবে আজ ৩ মে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হাসি দিবস’। মূলত সুস্বাস্থ্য, অনাবিল সুখ এবং বিশ্বশান্তির বারতা ছড়িয়ে দিতেই প্রতিবছর এই দিনটি ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়।
প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততা, ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা আর নাগরিক জীবনের নানাবিধ চাপে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন ‘হাসিই মহৌষধ’—এই চিরন্তন সত্যটি মনে করিয়ে দিতেই দিনটির পথচলা। বর্তমান বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি যখন একটি বড় সংকট, তখন কোনো অর্থব্যয় ছাড়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রাণখুলে হাসা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, হাসলে শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটে, যা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে এবং মানসিক চাপ বা কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমিয়ে আনে।
এই বিশেষ দিবসটির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর শিকড় প্রোথিত আছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে। ১৯৯৮ সালের ১০ জানুয়ারি মুম্বাইয়ের মাটিতে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। এর নেপথ্যে কারিগর ছিলেন ডা. মদন কাটারিয়া। তিনি বিশ্বজুড়ে ‘লাফটার যোগা’ বা হাস্যযোগ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। মূলত তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই হাসি কেবল একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং একটি বিশ্বজনীন আন্দোলনের রূপ নেয়। পরবর্তীতে ২০০০ সাল থেকে মে মাসের প্রথম রবিবার দিনটি পালনের প্রথা শুরু হয়।
বিশ্বজুড়ে ১০৫ দেশে ছড়িয়ে পড়া এক উৎসব
শুরুটা মুম্বাইয়ে হলেও আজ তা কোনো সীমানায় আটকে নেই। বর্তমানে বিশ্বের ১০৫টিরও বেশি দেশে হাজার হাজার ‘লাফটার ক্লাব’ বা হাস্যযোগ ক্লাব গড়ে উঠেছে। পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা কর্পোরেট অফিসের ছাদেও এখন দেখা মেলে সম্মিলিত হাসির আসর। এই ক্লাবগুলোর মূল মন্ত্র হলো—কোনো কারণ ছাড়াই হাসুন। মানুষ যখন কোনো কৌতুক বা হাসির কারণ ছাড়াই স্রেফ ব্যায়াম হিসেবে হাসতে শুরু করে, শরীর ও মস্তিষ্ক কিন্তু তার ইতিবাচক প্রভাব গ্রহণ করতে ভুল করে না।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, হাসির কোনো ভাষা নেই, কোনো ধর্ম নেই। এটি এক নিমিষেই অচেনা মানুষকে আপন করে নিতে পারে। আজকের এই সংঘাতময় বিশ্বে যেখানে বিভাজন প্রকট, সেখানে হাসি হতে পারে সম্প্রীতির এক শক্তিশালী মাধ্যম। এ কারণেই ডা. কাটারিয়া বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় হাসিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
হাসি কেন প্রয়োজন? কিছু মূল তথ্য:
-
মানসিক প্রশান্তি: হাসি সরাসরি মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে উদ্দীপিত করে এবং অবসাদ দূর করে।
-
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা: উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত প্রাণ খুলে হাসার বিকল্প নেই।
-
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি হাসেন তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি ও টি-সেল বেশি সক্রিয় থাকে।
-
সামাজিক বন্ধন: সম্মিলিত হাসি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও সংহতি বাড়াতে সাহায্য করে, যা একাকীত্ব দূর করে।
ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলো আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে আমরা যেন আমাদের আদি ও অকৃত্রিম হাসিটি হারিয়ে না ফেলি, বিশ্ব হাসি দিবস সেই সতর্কবার্তাই দেয়। কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিনে নয়, বরং প্রতিদিনের রুটিনে কয়েক মিনিট হাসি অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্পোরেট স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে ‘লাফটার থেরাপি’ আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।





