জাতীয় ফিচার

বঙ্গোপসাগরের মাছসম্পদ সংকটে সতর্কবার্তা: নতুন জরিপে ৬৫ অজানা প্রজাতির আবিষ্কার

সমুদ্রের অমূল্য মাছসম্পদ প্রকৃতির অদ্বিতীয় দান হলেও অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্যশিকার এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ‘ইকোসিস্টেম অ্যাপ্রোচ টু ফিসারিজ (ইএএফ)-নানসেন সার্ভে ২০২৫’ জরিপের প্রাথমিক ফলাফল এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে, যা দেশকে টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করছে। এই জরিপে বঙ্গোপসাগরে ৬৫টি নতুন মেরিন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫টি প্রজাতি বিশ্বের অন্য কোনো সাগরে নেই—শুধু এই অঞ্চলেরই অনন্য সম্পদ।

রোববার (৩০ নভেম্বর) হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ইএএফ-নানসেন সার্ভে ২০২৫’ এর ফলাফল ও করণীয় বিষয়ক ডি-ব্রিফিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, “অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার ফলে সামগ্রিক মাছের স্টক কমছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। বর্তমানে ২৭৩টি শিল্প ট্রলারের মধ্যে মাত্র ৭২টিতে সোনার (সাউন্ড নেভিগেশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর অসঠিক ব্যবহারে অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা এবং অপচয় বেড়ে যাচ্ছে।” জরিপে আরও উঠে এসেছে চিন্তার কারণ: বঙ্গোপসাগরের কিছু অংশে অক্সিজেনের ঘনত্ব কমে যাওয়া, স্বল্প অক্সিজেনের অঞ্চলের বিস্তার, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উচ্চ ঘনত্ব এবং জেলিফিশের অস্বাভাবিক প্রসার—এসব সতর্ক সংকেত সামুদ্রিক পরিবেশের গুরুতর ঝুঁকি নির্দেশ করছে।

উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, “সাগর আমাদের অমূল্য সম্পদ, কিন্তু আমাদেরই অব্যবস্থাপনা তার ধ্বংস ডেকে আনছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবে।” তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের লাইসেন্স কঠোরভাবে সীমিত করা এবং ট্রলারভিত্তিক আহরণের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের তাগিদ দেন। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব এবং পরিবেশ দূষণের কারণে পেলাজিক (উপরের স্তরের) ও ডেমার্সাল (তলানির স্তরের) মাছের স্টকের হ্রাসও জরিপে চিহ্নিত হয়েছে, যা উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সমন্বিত বৈঠক করে দ্রুত করণীয় নির্ধারণ করবে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি নরওয়ে সরকার ও এফএও-কে ২০২৭/২০২৮ সালের পরবর্তী জরিপে সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং বাংলাদেশের নিজস্ব গবেষণা জাহাজ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এই জরিপের ফলাফল নতুন মৎস্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, সম্পদ সংরক্ষণ কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর উপকারে আসবে।

অনুষ্ঠানে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের। তিনি বলেন, “নরওয়ে ও এফএও-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ও আধুনিক জরিপ পদ্ধতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ২০১৮ সালের নানসেন জরিপ ছিল এক মাইলফলক, যা সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর আমাদের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের প্রথম ইকোসিস্টেমভিত্তিক মূল্যায়ন দিয়েছে।” সচিব নিশ্চিত করেন, উন্মুক্ত আলোচনায় দেওয়া সকল সুপারিশ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গত ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই জরিপটি ছিল ২০১৮-এর পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ মেরিন ইকোসিস্টেম জরিপ, যা দেশের সম্পূর্ণ এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা কভার করেছে। বিশ্বখ্যাত গবেষণা জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডজোফ নানসেন—যা ১৯৭৯ সাল থেকে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসমীক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে—এই মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ব্রিফিংয়ে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রয়্যাল নরওয়েজিয়ান রাষ্ট্রদূত হোকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন এবং এফএও প্রতিনিধি ড. জিয়াওকুন শি।

প্রযুক্তিগত ব্রিফিং দেন নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন রিসার্চের বিভাগীয় প্রধান ও ক্রুজ লিডার ড. এরিক ওলসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের প্রফেসর ও টিম লিডার সাইদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও সহ-ক্রুজ লিডার ড. মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন। এফএও বাংলাদেশের জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী ও জরিপের ফোকাল পয়েন্ট ড. মো. আবুল হাসানাত স্বাগত বক্তব্য রাখেন। বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অত্যাচারের কারণে সামুদ্রিক জীবসংকট এখনই সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে ঠেকাতে হবে—নতুবা ব্লু ইকোনমির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র