ট্রাম্প-মাস্ক দ্বন্দ্বে নতুন মোড়: ‘আমেরিকা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ধনকুবের ইলন মাস্কের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রাম্পের বাজেট বিলের তীব্র সমালোচনার পর মাস্ক যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমেরিকা পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুক্রবার ট্রাম্পের নতুন কর হ্রাস ও ব্যয় বিল আইনে পরিণত হওয়ার পরদিন মাস্ক তার মালিকানাধীন এক্স প্ল্যাটফর্মে লিখেন, “‘আমেরিকা পার্টি’ আজ গঠিত হলো, যাতে জনগণের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা যায়।” তিনি দাবি করেন, এই বিল দেশকে দেউলিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাস্কের মতে, বিলটি জাতীয় ঋণ ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেবে, যা জনগণের ওপর অসহনীয় ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেবে।
মাস্ক এক্সে একটি জরিপ চালিয়ে জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন রাজনৈতিক দল প্রয়োজন কি না। প্রায় ১২ লাখ ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা নতুন দলের পক্ষে মত দেন। এরপরই তিনি ‘আমেরিকা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা দেন, যার লক্ষ্য “৮০ শতাংশ মধ্যমপন্থী জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা।”
একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাস্ক ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডজ) পরিচালনা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ব্যয় কমানো। কিন্তু নতুন বাজেট বিলে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমা বৃদ্ধি ও ট্যাক্স কাটের বিষয়ে মতবিরোধের জেরে তাদের সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। মাস্ক এই বিলকে “অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে ভরা” এবং “আমেরিকাকে দেউলিয়া করার” পথ বলে সমালোচনা করেন।
মাস্ক হুমকি দিয়েছেন, যারা এই বিল সমর্থন করেছেন তাদের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারাতে তিনি অর্থ ব্যয় করবেন। পাল্টা হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, মাস্কের টেসলা ও স্পেসএক্সের সরকারি ভর্তুকি ও চুক্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে। ট্রাম্প এমনকি দাবি করেন, মাস্ক বিলের বিরোধিতা করছেন কারণ এতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ভর্তুকি বাতিল করা হয়েছে, যা টেসলার জন্য ক্ষতিকর। মাস্ক এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি সবসময় ভর্তুকি বাতিলের পক্ষে ছিলেন।
ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইলনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ, আমি তার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নই।” তিনি মাস্কের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অর্থায়ন করলে “গুরুতর পরিণতি” ভোগ করার হুমকি দেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাস্কের ‘আমেরিকা পার্টি’ ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ১৬০ বছরের দ্বি-দলীয় আধিপত্যের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর হাবিব বলেন, “মাস্কের আর্থিক শক্তি ও এক্স প্ল্যাটফর্মের প্রভাব তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী খেলোয়াড় করে তুলতে পারে। কিন্তু নতুন দল গঠন করে ভোটারদের আস্থা অর্জন করা দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।”
মাস্কের এই পদক্ষেপ রিপাবলিকান পার্টির জন্য ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল মাস্কের সমালোচনার সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, “এই বিল জাতীয় ঋণ বাড়াবে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।” তবে, হাউস স্পিকার মাইক জনসন মাস্কের সমালোচনাকে “অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক” বলে উড়িয়ে দেন।
মাস্ক দাবি করেন, বাইডেন প্রশাসনের আমলে জাতীয় ঋণের ঘাটতি ছিল ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ট্রাম্পের নীতিতে ২.৫ ট্রিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে আমেরিকা দেউলিয়া হয়ে যাবে।” তিনি জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধই সরকারি আয়ের ২৫ শতাংশ গ্রাস করছে বলে সতর্ক করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক মাইকেল রবিনসন বলেন, “মাস্কের নতুন দলের আইডিয়া আকর্ষণীয়, কারণ দুই দলের রাজনীতি আমাদের ক্লান্ত করে ফেলেছে। তবে এটা সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করবে তার পরিকল্পনার ওপর।”
ট্রাম্প-মাস্কের এই দ্বন্দ্ব ও নতুন দল গঠনের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভূ-প্রকৃতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তবে, এই পথে মাস্কের সামনে চ্যালেঞ্জ অপরিসীম।





