ট্রাম্পের শুল্কঝড়ে ধুঁকছে মার্কিন অর্থনীতি: ৮২৩০ কোটি ডলার ক্ষতির আশঙ্কা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। জেপি মরগান চেজ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমান শুল্কহার অব্যাহত থাকলে মাঝারি আকারের মার্কিন কোম্পানিগুলো ৮২৩০ কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এই নীতির ফলে কর্মী ছাঁটাই বাড়ছে, বিনিয়োগে ভাটা পড়ছে এবং ভোক্তা ব্যয় কমছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চীন, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের আমদানির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এই শুল্কনীতি মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে এবং দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করবে। কিন্তু ফলাফল হয়েছে উল্টো। জেপি মরগানের বিশ্লেষণে বলা হয়, এই শুল্কের কারণে খুচরা ও পাইকারি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ এই শিল্পগুলো আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। উচ্চ শুল্কের ফলে কাঁচামাল ও পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা বিক্রির হার ০.৯% কমেছে। ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বাজারে চাহিদা কমছে, যা ব্যবসায়ীদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া, বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। জেপি মরগানের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাইকেল ফেরোলি বলেন, “শুল্কনীতি শুধু দাম বাড়াচ্ছে না, ব্যবসায়িক আস্থাও ধ্বংস করছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হতে পারে।”
শুল্কনীতির প্রভাবে মার্কিন চাকরির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশটির বেকারত্বের হার ৪.২%-এ পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। জেপি মরগানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুল্কনীতি অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বেকারত্বের হার ৫.৩%-এ উঠতে পারে। বড় বড় কোম্পানিগুলো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে কর্মী ছাঁটাইয়ের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে, খুচরা, উৎপাদন ও সরবরাহ শিল্পে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
নিউ ইয়র্কের একজন খুচরা ব্যবসায়ী জন মার্টিন বলেন, “আমদানি পণ্যের দাম বাড়ায় আমাদের মুনাফা কমছে। কর্মীদের বেতন বাড়ানো বা নতুন নিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের স্টাফ কমাতে হচ্ছে।” এই পরিস্থিতি শুধু কর্মীদের জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। জেপি মরগানের প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৫ সালে বিনিয়োগ ৪.৪% কমতে পারে। শুল্কের কারণে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমছে, যা শেয়ার বাজারে অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৮% নেমে যায়, যা ৫.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্য হ্রাসের কারণ হয়।
জেপি মরগানের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন তার বার্ষিক শেয়ারহোল্ডার চিঠিতে বলেন, “শুল্কনীতি মার্কিন অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে ক্ষতি আরও বাড়বে।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, শুল্কের ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলার ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি শুধু মার্কিন অর্থনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। চীন ৮৪% প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছে, যা মার্কিন রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধাক্কা। ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের মতো দেশগুলোও প্রতিশোধমূলক শুল্কের পরিকল্পনা করছে। এই বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ২.৯%-এ নেমে আসতে পারে, যা ২০২৪ সালের ৩.৩% থেকে কম।
জেপি মরগানের পূর্বাভাসে বলা হয়, শুল্কনীতি অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন অর্থনীতি মন্দায় প্রবেশ করতে পারে, যেখানে জিডিপি ০.৩% সংকুচিত হবে।





