‘জুলাই ঘোষণাপত্রে যা কিছু তুলে ধরা হলো’
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আজ মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেছেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘৩৬ জুলাই উদযাপন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র-জনতা এবং সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এই ঘোষণাপত্রটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের প্রতিফলন। এটি দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যেখানে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অদম্য লড়াইয়ের বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনকালে দুর্নীতি, গুম-খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।
ঘোষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন একটি পূর্ণাঙ্গ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে নারী, শিশুসহ প্রায় এক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, অসংখ্য মানুষ পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্বের শিকার হয়। তবে জনগণের অদম্য সাহস এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনের মাধ্যমে ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগে বাধ্য হন।
এই ঘোষণাপত্রে জনগণের কয়েকটি মূল দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি, এবং গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচার। এছাড়াও পরিবেশ ও জলবায়ুসহিষ্ণু টেকসই উন্নয়ন এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন ছাত্রনেতা বলেন, “এই ঘোষণাপত্র আমাদের সংগ্রামের স্বীকৃতি। এটি আমাদের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি।”
অধ্যাপক ইউনূস তার বক্তব্যে জনগণের ঐক্য এবং তরুণদের সাহসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “এই ঘোষণাপত্র শুধু একটি দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের জনগণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আমরা সকলে মিলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলব।”
এই ঘোষণাপত্রটি আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানে সংযোজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





