ইরানে হামলা ‘পূর্বপ্রহার’ যুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের এক গোপন শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে সামরিক হামলার নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ চালাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, যা তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করে তুলত। তাই ট্রাম্প প্রশাসন আগামী সংঘাত এড়াতে পূর্বপ্রহার চালিয়েছে।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ক্যাপিটল হিলে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রুবিওর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সিআইএ প্রধান জন র্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন। শুনানির পর সাংবাদিকদের সামনে রুবিও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট ছিল যে ইরানে কোনো হামলা হলে—সেটা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা অন্য কারও দ্বারা—তারা পাল্টা জবাব দেবে এবং সেই জবাব যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হবে।’
এই বক্তব্য কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, কেউ এটিকে যৌক্তিক বলে মেনে নিয়েছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনের পরিকল্পনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
এই ঘটনার পটভূমি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘শেষ সুযোগ’ বলে বর্ণনা করেছেন, যার লক্ষ্য ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি ধ্বংস করা, নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন করা, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন রোধ করা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করা।
চতুর্থ দিনে পৌঁছে এই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইসরায়েল লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়েছে, যেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে। ইরান পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোকে লক্ষ্য করেছে, যার ফলে সৌদি আরব এবং কুয়েতে দূতাবাস বন্ধ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ১৪টি দেশ থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইরানী রেড ক্রিসেন্টের তথ্যানুসারে, ইরানে কমপক্ষে ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন, যদিও স্থানীয় সূত্রে সংখ্যাটি হাজার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সেনা সদস্য কুয়েতে ইরানী আক্রমণে নিহত হয়েছেন।
এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর। তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, কারণ ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। বিশ্ববাজারে শেয়ারের দরপতন ঘটেছে, এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি ২০২৫ সাল থেকে চলছে, যা পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা থেকে যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্যকে পাল্টে দিতে পারে, যেন একটি দাবার খেলায় রাজাকে মাত দেওয়ার চাল চলা হয়েছে, কিন্তু পাল্টা চালের ঝুঁকি রয়েছে।
কংগ্রেসে এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। চলতি সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাবের ভোট হতে পারে, যাতে প্রেসিডেন্টকে ইরানের সঙ্গে শত্রুতা শেষ করতে বাধ্য করার আহ্বান রয়েছে। তবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রশাসনের যুক্তিকে ‘পরস্পরবিরোধী’ বলে সমালোচনা করেছেন, যেখানে একদিকে পূর্বপ্রহারের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
এই যুদ্ধের পিছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে। ২০২৩ সালের হামাসের হামলা থেকে শুরু করে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ১৮০টিরও বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছে। রুবিওর ব্যাখ্যা এটিকে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ বলেছে, এটি অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা ছড়াতে পারে।





