জাতীয় ফিচার

আদানির সঙ্গে চুক্তির ৪৫০০ কোটি ডলার শুল্ক ফাঁকিতে দুদকের নতুন তদন্ত

রাষ্ট্রক্ষমতার অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ফলে আলোকিত হয়েছে ভারতের প্রভাবশালী ব্যবসায়িক দৈত্য আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তির অন্ধকার অধ্যায়। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক গোপনীয় প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, মাত্র এক বছরে প্রায় ৩৯.৭৪ কোটি মার্কিন ডলারের শুল্ক ও কর ফাঁকির সুস্পষ্ট চিহ্ন—যা বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। এই চুক্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অন্যান্য সংস্থাকে পুরোপুরি বাইপাস করে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন এই মহা-অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্তে নামছে। গতকাল (৩০ অক্টোবর) সংস্থাটি একটি তিন সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, যার নেতৃত্ব করবেন দুদকের উপ-পরিচালক আল-আমিন। অন্য সদস্য হলেন উপ-পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন এবং সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান। এই কমিটির সদস্যরা সরকারি টেন্ডার ও প্রকিউরমেন্টে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ, যারা চুক্তির কাঠামো, আর্থিক যৌক্তিকতা, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং স্বার্থের সংঘাতসহ সকল দিক খতিয়ে দেখবে। তদন্তের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ৪৫ দিন—যদি চুক্তি অবৈধ বা অযৌক্তিক প্রমাণিত হয়, তবে বাতিলের সুপারিশও করা হতে পারে। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এই গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চুক্তিটি ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত হয়, যা ২৫ বছর মেয়াদি। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় অবস্থিত আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে সরবরাহ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৯ মার্চ। ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ১,০৫৮ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১২৮ কোটি ডলার। কিন্তু ৩১% আমদানি শুল্কসহ কর-ভ্যাট মিলিয়ে ৩৯.৭৪ কোটি ডলারের রাজস্ব পাওয়ার কথা, যা একেবারেই পরিশোধ হয়নি। শুল্ক গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে এটিকে ‘ফাঁকি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ পিডিবি এনবিআরের অনুমোদন ছাড়াই শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে—যা আইনত শুধু রাজস্ব বোর্ডের অধিকার। গত বছরের ২৭ নভেম্বর ‘জাগো নিউজ’-এর একটি প্রতিবেদন এই অনিয়ম প্রথম উন্মোচন করে, এবং এপ্রিলে দুদক তদন্তের সূত্রপাত ঘটায়।

অন্তর্বর্তী সরকার গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর অধীনে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে, যা আদানি সহ ১১টি বিদ্যুৎ চুক্তি খতিয়ে দেখছে। ৩ অক্টোবর এই কমিটি ঘোষণা দেয়, গড্ডা প্ল্যান্টের মতো বড় প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও আইনি দিক বিশ্লেষণ করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তিতে আদানি বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে বেশি কর-সুবিধা পেয়েছে, যা দেশের স্বার্থবিরোধী। হাইকোর্টও এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে, যার প্রতিবেদন শীঘ্রই আসতে পারে।

এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ। মানবাধিকার ও অর্থনীতিবিদরা এটিকে ‘স্বার্থের সংঘাত ও দুর্নীতির নমুনা’ বলে অভিহিত করছেন। জাতীয় কমিটি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা চুক্তি বাতিলের দাবি তুলেছেন, যাতে দেশের অর্থনীতি রক্ষা পায়। দুদকের তদন্ত যদি গুরুতর অনিয়ম প্রমাণ করে, তবে আদানির সঙ্গে আইনি লড়াইয়ের পথও খুলে যাবে। এদিকে, আদানি গ্রুপ দাবি করছে চুক্তি স্বচ্ছ ও লাভজনক, কিন্তু তদন্তের ফলাফলই সত্যের মুখোশ খুলবে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র