অল্প হাঁটলেই কি পায়ে ব্যথা? শরীর দিচ্ছে বড় বিপদের সংকেত
সকালে একটু হাঁটাহাঁটি কিংবা দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে সামান্য পথ চললেই কি আপনার পায়ে টান ধরে, পায়ে ব্যথা করে? বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে গেলেও পা বাড়ালেই কি শুরু হয় ঝিনঝিন বা জ্বালাপোড়া? এই সাধারণ সমস্যাটিই হতে পারে কোনো গুরুতর রোগের আগাম বার্তা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, পায়ের ব্যথার ধরন বুঝে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে তা পঙ্গুত্বের কারণও হতে পারে।
ব্যথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কারণসমূহ
পায়ে ব্যথার পেছনে কেবল ক্লান্তি বা বয়সকে দায়ী করা ভুল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, হাঁটলে পায়ে ব্যথা হওয়া এবং বিশ্রাম নিলে তা সেরে যাওয়াকে অনেক সময় ‘ক্লডিকেশন’ বলা হয়। এটি মূলত রক্ত সঞ্চালনের সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। যখন পায়ের ধমনিতে চর্বি জমে রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে যায়, তখন হাঁটার সময় পেশিগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। ফলে তীব্র ব্যথা বা ক্র্যাম্প অনুভূত হয়।
তবে কেবল রক্ত সঞ্চালনই নয়, স্নায়ুর সমস্যাও এর একটি বড় কারণ। মেরুদণ্ডের নিচের অংশের হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা ডিস্ক সরে যাওয়ার ফলে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে। এতে পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশ ভাব বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। এছাড়া শরীরে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম বা ভিটামিন ডি-এর অভাব থাকলেও পেশিতে টান ধরার প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পায়ের এই অবশ ভাব বা ব্যথা ‘ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি’র লক্ষণ হতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ব্যথার ধরন ও লক্ষণ বিশ্লেষণ
পায়ের ব্যথা সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কারো ক্ষেত্রে পায়ের ডিম বা কাফ মাসল-এ তীব্র টান ধরে, আবার কারো ক্ষেত্রে পায়ের তলায় বা গোড়ালিতে জ্বালাপোড়া হয়।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সম্মেলনে চিকিৎসকদের আলোচনার সূত্র ধরে বলা যায়, যদি দেখা যায় যে নির্দিষ্ট দূরত্ব হাঁটার পর ঠিক একই জায়গায় ব্যথা হচ্ছে, তবে বুঝতে হবে এটি ধমনি সংক্রান্ত সমস্যা। অন্যদিকে, যদি হাঁটার সময় পিঠ থেকে ব্যথা পায়ের দিকে নামে, তবে সেটি স্নায়বিক সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অনেক সময় পায়ের হাড়ের সংযোগস্থলে ইউরিক অ্যাসিড জমেও প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা হাঁটাচলাকে দুর্বিষহ করে তোলে।
প্রতিকার ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
পায়ের ব্যথায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
-
রক্ত পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং: রক্তে শর্করা বা ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল এবং ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা পরীক্ষা করা জরুরি।
-
সঠিক জুতো নির্বাচন: অনেক সময় অনুপযুক্ত বা শক্ত তলার জুতো ব্যবহারের কারণেও পায়ে ব্যথা হয়। নরম ও আরামদায়ক জুতো ব্যবহার এই সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে।
-
পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস: ডায়েটে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। ডাবের পানি, কলা এবং দুগ্ধজাত খাবার পেশির সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
-
নিয়মিত ব্যায়াম: ব্যথার ভয়ে হাঁটা একদম বন্ধ করা যাবে না। ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের নির্দিষ্ট কিছু স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ করলে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয়।
-
ধূমপান বর্জন: ধমনির ব্লক বা রক্ত চলাচলের বাধা দূর করতে ধূমপান পরিহার করা বাধ্যতামূলক, কারণ এটি রক্তনালীকে আরও সংকুচিত করে দেয়।
একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ
-
বিশ্রামে উপশম: হাঁটার সময় ব্যথা শুরু হওয়া এবং ৫-১০ মিনিট বিশ্রামে তা কমে যাওয়া ‘পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ’ (PAD)-এর লক্ষণ।
-
ঝিনঝিন বা অবশ ভাব: এটি ভিটামিন বি-১২ এর অভাব বা মেরুদণ্ডের স্নায়ুর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
-
পায়ের ফোলা ভাব: ব্যথার সাথে যদি পা ফুলে যায়, তবে তা হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
পায়ের ব্যথাকে আমরা অনেকেই ‘বয়সের দোষ’ বা ‘অল্প একটু ব্যথা’ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পা হলো আমাদের শরীরের ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কালার ডপলার টেস্ট বা এমআরআই-এর মাধ্যমে খুব সহজেই ব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব।





