স্কোর বাড়লেও স্বস্তি নেই: দুর্নীতিতে আরও এক ধাপ পিছাল বাংলাদেশ
বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির ব্যাধি কতটা গভীর, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। ২০২৫ সালের ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক’ (সিপিআই) অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩তম। মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগজনক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
১৮২টি দেশের এই তালিকায় ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর এবার ২৪। গত বছরের তুলনায় স্কোর ১ পয়েন্ট বাড়লেও বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির বদলে অবনতি হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছিল তালিকার ১৪তম অবস্থানে, যা থেকে এক ধাপ পিছিয়ে এবার ১৩তম স্থানে দাঁড়িয়েছে দেশটি। বৈশ্বিক গড় স্কোর যেখানে ৪২, সেখানে বাংলাদেশের এই ২৪ স্কোর দুর্নীতি দমনে দেশের নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
এক নজরে সূচকের পরিসংখ্যান
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। সূচকের মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
-
বর্তমান অবস্থান: ১৮২টি দেশের মধ্যে নিচ থেকে ১৩তম।
-
প্রাপ্ত স্কোর: ১০০-এর মধ্যে ২৪ (২০২৪ সালে ছিল ২৩)।
-
র্যাঙ্কিং পরিবর্তন: গত বছরের তুলনায় এক ধাপ অবনতি।
-
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বৈশ্বিক গড় ৪২ থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে।
স্কোর বাড়ল, তবে র্যাঙ্কিং নামল কেন?
সাধারণত স্কোর বাড়লে তালিকার অবস্থানে উন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন উল্টো ঘটল? এই প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “স্কোর ১ পয়েন্ট বাড়ার পেছনে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি প্রত্যাশা বা প্রাথমিক মূল্যায়নের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির যে শেকড়, তা উপড়ে ফেলার মতো কার্যকর সংস্কার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। অন্য অনেক দেশ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের চেয়ে দ্রুত গতিতে ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা এগিয়ে গেছে, ফলে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর গভীরে যে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া এখনো বড় কোনো মাইলফলক ছুঁতে পারেনি। বিশেষ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং দুদকের মতো সংস্থাগুলোর অকার্যকারিতা সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বৈশ্বিক চিত্র: কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
২০২৫ সালের এই সূচকে ৮৯ স্কোর নিয়ে বরাবরের মতোই সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্ক। তালিকার ওপরের দিকে থাকা অন্যান্য দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ড (৮৮) ও সিঙ্গাপুর (৮৪) অন্যতম। অন্যদিকে, মাত্র ৯ স্কোর নিয়ে তালিকার তলানিতে বা সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে যৌথভাবে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান ৭১ স্কোর নিয়ে নিজের পরিচ্ছন্ন অবস্থান ধরে রেখেছে। ভারত ও মালদ্বীপের স্কোর ৩৯, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক উন্নত।
প্রতিবেদনের শেষাংশে টিআইবি গুরুত্ব দিয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের ওপর। ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, “দুর্নীতি কেবল একটি নৈতিক অবক্ষয় নয়, এটি উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়।” অর্থ পাচার রোধ, দুদকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রভাবশালীদের দুর্নীতির বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই সূচকে বড় কোনো উল্লম্ফন সম্ভব নয়।





