যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় আটকে থাকা ৫ বড় শর্ত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরান-মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়। পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালী বন্ধ এবং জ্বালানি সংকটের পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি এলেও ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় স্থায়ী সমাধান মেলেনি। মূলত পাঁচটি মৌলিক শর্তেই আটকে আছে দুই পক্ষের সমঝোতা।
টানা ৩৯ দিনের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্য কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। একই সঙ্গে বিশ্ব তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। তেলের দাম বাড়ে, শিপিং ব্যয় বাড়ে এবং বহু দেশ বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে পড়ে।
গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump একক সিদ্ধান্তে সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ান। এতে তাৎক্ষণিক সংঘাত কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক সমাধান এখনও অনিশ্চিত।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা শান্তি আলোচনায় বসেন। তবে আলোচনা শেষে কোনো যৌথ ঘোষণা আসেনি। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ কয়েকটি মূল ইস্যুতে বড় ধরনের মতপার্থক্য থেকেই গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় বাধা হয়ে থাকা ৫ প্রধান শর্ত
১. পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কঠোরভাবে সীমিত করুক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি মেনে নিক। কিন্তু তেহরান বলছে, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং এটি পুরোপুরি বন্ধ করা হবে না।
২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরানের প্রধান দাবি হলো—অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দ্রুত ও কার্যকরভাবে তুলে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ধাপে ধাপে আস্থা তৈরি না হলে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব নয়। এই ‘আগে কে’ প্রশ্নেই আলোচনা বারবার থমকে যাচ্ছে।
৩. আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। ইরান পাল্টা যুক্তি দেয়, এগুলো আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। এই ইস্যুতে ছাড় দিতে উভয় পক্ষই অনাগ্রহী।
৪. হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। ইরান এটিকে নিজের কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে দেখে। স্থায়ী চুক্তিতে এই রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় শর্ত হয়ে উঠেছে।
৫. ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা
ইরান চায়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যেন আর একতরফা সামরিক হামলা না চালায়—এমন নিশ্চয়তা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এমন বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি দিতে নারাজ। এখানেই সবচেয়ে গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ থামানো যত সহজ, শান্তি প্রতিষ্ঠা তত কঠিন। কারণ বন্দুক নীরব হলেও অবিশ্বাস নীরব হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি এই পাঁচ শর্তে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আবারও বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।





