মেহেদি দিলে কারও কারও কেন সমস্যা হয়?
ঈদ, বিয়ে কিংবা যেকোনো সামাজিক উৎসবে বাঙালি নারীর হাত রাঙাতে মেহেদির জুড়ি নেই। কিন্তু এই আনন্দের রঙই কখনো কখনো ডেকে আনতে পারে চরম অস্বস্তি ও শারীরিক জটিলতা। অতি সম্প্রতি কৃত্রিম ও রাসায়নিকযুক্ত মেহেদি ব্যবহারের কারণে ত্বকে মারাত্মক অ্যালার্জি ও পোড়াজনিত (বার্ন) ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, অসচেতনতা এবং বাজারে প্রচলিত কিছু ক্ষতিকর পণ্যের কারণেই এই উৎসবের আনন্দ বিষাদে রূপ নিচ্ছে।
কেন এই বিপত্তি? আসল বনাম নকলের লড়াই
প্রাকৃতিক মেহেদি পাতা বাটা কখনোই ত্বকের জন্য ক্ষতিকর নয়। গোলমালটা পাকে মূলত বাজারে তৈরি ‘ইনস্ট্যান্ট’ বা ‘জরুরি’ মেহেদি কোনগুলোর ক্ষেত্রে। ৫ মিনিটে গাঢ় লাল রঙ পাওয়ার লোভেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদ।
-
রাসায়নিকের আগ্রাসন: জলদি রঙ আনতে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী করতে এই কসমো-মেহেদিগুলোতে মেশানো হয় প্যারা-ফিনাইলিনডায়ামিন (PPD) নামক একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর শিল্প-রাসায়নিক। এটি সাধারণত চুলের কালার বা ডাই-এ ব্যবহৃত হয়।
-
ত্বকের গভীর ক্ষত: পিপিডি সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে এলে ‘কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস’ বা তীব্র অ্যালার্জিক বিক্রিয়া তৈরি করে।
-
সংরক্ষণকারীর প্রভাব: মেহেদি দীর্ঘদিন ভালো রাখার জন্য ব্যবহৃত প্রিজারভেটিভ এবং তীব্র এসিডিক উপাদান ত্বকের ওপরের স্তরকে আক্ষরিক অর্থেই পুড়িয়ে ফেলে, যা দেখতে অনেকটা অ্যাসিড বার্নের মতো মনে হয়।
লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন সমস্যা হচ্ছে?
রাসায়নিকযুক্ত মেহেদি লাগানোর কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে ২-৩ দিনের মধ্যে ত্বকে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:
-
আক্রান্ত স্থানে তীব্র চুলকানি এবং ত্বক লাল হয়ে ফুলে যাওয়া।
-
ছোট ছোট পানির ফোসকা (Blisters) পড়া, যা পরে ফেটে গিয়ে ঘা-এর সৃষ্টি করে।
-
চামড়া খসে পড়া এবং তীব্র জ্বালাপোড়া হওয়া।
-
দীর্ঘমেয়াদে ওই স্থানে স্থায়ী কালো বা সাদা দাগ পড়ে যাওয়া।
প্রতিকার ও সচেতনতা: আক্রান্ত হলে কী করবেন?
মেহেদি লাগানোর পর যদি কোনো ধরনের অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া শুরু হয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত:
তাৎক্ষণিক করণীয়: জ্বালাপোড়া বা চুলকানি শুরু হওয়া মাত্রই প্রচুর ঠাণ্ডা পানি ও সাবান দিয়ে মেহেদি ধুয়ে ফেলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত স্থান চুলকানো যাবে না।
-
বরফ ও ময়েশ্চারাইজার: প্রাথমিক আরামের জন্য আক্রান্ত স্থানে বরফের সেঁক দেওয়া যেতে পারে। ধুয়ে ফেলার পর সুদিং লোশন বা খাঁটি নারকেল তেল লাগানো যেতে পারে।
-
অ্যালার্জির ওষুধ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টি-হিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে, যা চুলকানি ও ফোলাভাব দ্রুত কমিয়ে আনে।
-
স্টেরয়েড ক্রিম: পরিস্থিতি জটিল হলে বা ফোসকা পড়লে বিশেষজ্ঞ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের (Dermatologist) পরামর্শে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মৃদু স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করতে হতে পারে।
-
যা করবেন না: ফোসকা পড়লে তা নিজ দায়িত্বে গলিয়ে ফেলা সম্পূর্ণ নিষেধ। এতে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বা পুঁজ হওয়ার ঝুঁকি শতভাগ বেড়ে যায়।
সুরক্ষিত উপায়ে হাত রাঙানোর কিছু মূল পরামর্শ
ভবিষ্যতে এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে উৎসবের কেনাকাটায় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:
-
প্যাচ টেস্ট (Patch Test) বাধ্যতামূলক: যেকোনো নতুন ব্র্যান্ডের কোণ মেহেদি ব্যবহারের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কনুইয়ের ভেতরের দিকে বা কানের পেছনে সামান্য লাগিয়ে পরীক্ষা করে নিন। যদি চুলকায় বা লাল হয়, তবে তা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
-
প্রাকৃতিক মেহেদির বিকল্প নেই: সবচেয়ে নিরাপদ হলো পাতা বেটে ব্যবহার করা। সময় একটু বেশি লাগলেও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত।
-
মোড়কের তথ্য যাচাই: মেহেদি কেনার আগে তার উপাদান (Ingredients) এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখে নিন। যেসব পণ্যে তীব্র রাসায়নিক গন্ধ পাওয়া যায়, সেগুলো এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
উৎসবের আনন্দ তখনই সার্থক হয় যখন তা নিরাপদ থাকে। ক্ষণিকের সৌন্দর্যের জন্য নিজের মূল্যবান ত্বককে স্থায়ী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।





