জীবনযাপন ফিচার স্বাস্থ্য

মাসের নির্দিষ্ট সময়ে কেন বাড়ে নারীদের মানসিক অস্থিরতা?

মাসের নির্দিষ্ট সময়ে কেন বাড়ে নারীদের মানসিক অস্থিরতা?

নারীদের শারীরিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অকারণ দুশ্চিন্তা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা তীব্র অস্থিরতা কেবল ‘মুড সুইং’ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে শরীরের অভ্যন্তরীণ হরমোন ও মাসিক চক্রের গভীর বিজ্ঞান।


হরমোনের টানাপোড়েন ও মনের ওঠানামা

অনেক নারীই খেয়াল করেন, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর সাথে সাথে তাদের মনের আকাশেও মেঘ জমে। কোনো কারণ ছাড়াই কান্না পাওয়া, তুচ্ছ ঘটনায় বিরক্ত হওয়া বা অজানা আশঙ্কায় ভোগা—এই সমস্যাগুলো আসলে শরীরের জৈবিক ঘড়ির একটি অংশ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, মাসিক চক্রের চারটি ধাপের মধ্যে শেষ পর্যায় বা ‘লেট লুটিয়াল ফেজ’ (Late Luteal Phase) হলো সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। মাসিক শুরু হওয়ার ঠিক ৭ থেকে ১০ দিন আগে নারীদের শরীরে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে।

এই সময়ে শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে কমতে শুরু করে। এই হরমোনগুলোর হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কের ‘সেরোটোনিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ওপর। সেরোটোনিনকে বলা হয় আমাদের শরীরের ‘ফিল গুড’ হরমোন, যা আমাদের মন শান্ত ও প্রফুল্ল রাখতে সাহায্য করে। যখনই এর ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি দানবীয় রূপ নিয়ে হাজির হয়।

পিএমএস নাকি পিএমডিডি?

সাধারণ এই অস্থিরতাকে আমরা প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (PMS) বলে জানি। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এই মানসিক চাপ এতটাই তীব্র হয় যে তারা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে হিমশিম খান। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (PMDD)। আমাদের সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা কম থাকায় অনেক নারীই মনে করেন এটি হয়তো তাদের চারিত্রিক দুর্বলতা বা মানসিক ত্রুটি। কিন্তু আদতে এটি একটি নিরেট শারীরিক ও রাসায়নিক বাস্তবতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্থিরতা কেবল মানসিক নয়, এর সাথে শারীরিক ক্লান্তি, অনিদ্রা এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও যুক্ত থাকে। ফলে মাসের ওই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে নারীরা সামাজিক ও পেশাগত জীবনে কিছুটা কোণঠাসা বোধ করেন।


গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও লক্ষণ:

নারীদের এই বিশেষ সময়ের উদ্বেগ বুঝতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:

  • সময়ের গুরুত্ব: এই উদ্বেগ সাধারণত মাসিক শুরু হওয়ার ১-২ দিনের মধ্যে কমতে শুরু করে।

  • সেরোটোনিনের ভূমিকা: হরমোনের ওঠানামা মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে বিষণ্ণতা তৈরি করে।

  • শারীরিক প্রভাব: বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা বা মাথাব্যথাও এই মানসিক চাপের সঙ্গী হতে পারে।

  • অকাল দুশ্চিন্তা: কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা এই সময়ের অন্যতম লক্ষণ।

  • জীবনযাত্রা: ক্যাফেইন, অতিরিক্ত লবণ এবং চিনিযুক্ত খাবার এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।


সমাধানের পথ ও সামাজিক সচেতনতা

এই সমস্যার কোনো জাদুকরী সমাধান না থাকলেও জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পুষ্টিবিদরা এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা ব্যায়াম এবং সুষম খাবারের ওপর জোর দেন। বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়ক।

তবে সবচেয়ে বড় সমাধান হলো সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন। পরিবারের সদস্যদের বুঝতে হবে যে, এই সময়কার বিরক্তি বা কান্না কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি শারীরিক পরিক্রমা। কর্মক্ষেত্রেও নারীদের এই বিশেষ সময়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার