বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেলো যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি ২০২৬) দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যৌথ ঘোষণায় সংস্থাটির সদস্যপদ ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারীতে WHO-এর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ, সংস্কারের অভাব এবং চীনের প্রভাব। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই (২০ জানুয়ারি ২০২৫) এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হয়। এক বছরের নোটিশ পিরিয়ড শেষে এটি কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, WHO কোভিড মহামারীতে চীনের ভূমিকা ঢেকে রেখেছে এবং সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভার অসমান্য, যখন চীনের মতো দেশ কম অবদান রাখছে।
এই প্রস্থানের পটভূমি দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে একই চেষ্টা করা হয়, কিন্তু জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে তা প্রত্যাহার করেন। এবার দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প সেই প্রতিশ্রুতি পালন করলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় মনোনিবেশ করবে, WHO-এর সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ রাখবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিপদে পড়বে, কারণ রোগের তথ্য-আদান-প্রদানে WHO অপরিহার্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য এটি বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় দাতা, ২০২২-২০২৩ সালে ১.২৮৪ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ। এখন ২০২৪-২০২৫ সালের ২৭৮ মিলিয়ন ডলার বকেয়া রেখেই বেরিয়ে গেছে। WHO-এর মহাপরিচালক টেডরোস আধানম গেব্রেইয়েসুস বলেছেন, এটি ‘লুজ-লুজ’ পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিশ্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জার্মানি জাতীয় দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বলছে এতে মহামারী প্রতিরোধ দুর্বল হবে। চীন এবং রাশিয়া মতো দেশগুলো হয়তো এই শূন্যতা পূরণ করতে চাইবে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য নীতিতে নতুন ভারসাম্যহীনতা আনতে পারে। আফ্রিকা এবং এশিয়ার নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এইচআইভি, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা প্রতিরোধ প্রোগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে চলত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই প্রস্থান বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্লু ভাইরাসের নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল হলে নতুন মহামারী ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যও প্রভাবিত হবে, কারণ বিদেশী রোগের তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। ইনফেকশাস ডিজিজ সোসাইটি অব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডা. রোনাল্ড নাহাস বলেছেন, “জীবাণু সীমানা মানে না, বিশ্ব সহযোগিতা ছাড়া আমরা সকলে অরক্ষিত।”
এই ঘটনা বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের অনুপস্থিতিতে WHO-কে নতুন দাতা খুঁজতে হবে। জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন মতো সংস্থা ইতিমধ্যে অবদান বাড়িয়েছে, কিন্তু পুরো শূন্যতা পূরণ কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি স্বাস্থ্য কূটনীতির একটি পরীক্ষা, যেখানে রাজনীতি স্বাস্থ্যের উপর ছায়া ফেলছে।





