জাতীয় ফিচার

নিয়ন্ত্রণহীন হামে শিশুমৃত্যু ৫০০ ছাড়াল: তথ্যের ঘাটতিতে আড়ালেই মূল ঝুঁকি

হামে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, দেড় মাসে প্রাণ গেল ২৪০ জনের

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাবেই এই রোগে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৫০০-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন গড়ে সাতজনেরও বেশি শিশু প্রাণ হারাচ্ছে এবং প্রতি মাসেই মৃত্যুর গ্রাফ আগের মাসের চেয়ে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

মৃত্যুর মিছিলে নতুন ১৩ প্রাণ

গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে পাঠানো সর্বশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে আরও ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই ১৩ জনের মধ্যে ১ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, আর বাকি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। এই নতুন হতাহতের সংখ্যা যোগ হওয়ার পর, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে একটি নীরব মহামারি হিসেবে দেখছেন, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

তথ্যের অস্বচ্ছতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করলেওEpidemiological বা রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি তথ্য আড়ালই থেকে যাচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আক্রান্ত বা মৃত শিশুদের বয়সসীমা কত, তারা কোন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে এসেছে কিংবা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ছিল কি না—তার কোনো উল্লেখ থাকছে না।

এমনকি লক্ষণ প্রকাশের কতদিন পর শিশুরা মারা যাচ্ছে কিংবা মৃত্যুর ঠিক আগে তারা কী ধরনের চিকিৎসা পেয়েছিল, সেই সংক্রান্ত কোনো ডেটাও প্রকাশ করা হচ্ছে না। প্রবীণ জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, সঠিক তথ্যের এই ঘাটতি মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন অঞ্চলে বা কোন বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে না জানলে টিকাদান কর্মসূচি বা জরুরি চিকিৎসাসেবা সঠিকভাবে বণ্টন করা অসম্ভব।

এক নজরে হাম পরিস্থিতির মূল চিত্র

  • মোট প্রাণহানি: ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

  • দৈনিক গড়: সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭ জনেরও বেশি শিশু এই রোগে মারা যাচ্ছে।

  • ক্রমবর্ধমান প্রবণতা: চলতি বছর প্রতি মাসেই মৃত্যুর সংখ্যা তার আগের মাসের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

  • তথ্যের অনুপস্থিতি: মৃতদের বয়স, সামাজিক শ্রেণী, টিকাদানের ইতিহাস এবং চিকিৎসার সময়কাল সম্পর্কিত তথ্যের চরম ঘাটতি রয়েছে।

কাঠামোগত দুর্বলতা ও আগামীর শঙ্কা

একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ে বছরের পর বছর কেন এমন সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন চিকিৎসকেরা। সাধারণত পুষ্টিহীনতা, টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবই হামের প্রকোপ বাড়ার প্রধান কারণ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ঢিলেঢালা ডেটা ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে যে, সংকটকে এখনো কতটা হালকাভাবে নেওয়া হচ্ছে।

হামের মতো একটি সংক্রামক ব্যাধিতে প্রতিদিন এত শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। শুধু মৃত্যুর সংখ্যা গুনে এই সংকটের গভীরতা মাপা যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবিলম্বে শুধু সংখ্যার খতিয়ান দেওয়া বন্ধ করে, মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ ও জনমিতি জনসমক্ষে আনতে হবে।

একই সাথে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং প্রান্তিক অঞ্চলের প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে না পারলে, এই মৃত্যুর মিছিল থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র