জাতীয় ফিচার

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও গণভোটের মুখোমুখি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কাল এক অবিস্মরণীয় দিন। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এবারের ভোট কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ভোটারদের হাতে থাকছে দেশের সংসদীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের চাবিকাঠি। ব্যালট পেপারের একটি ঘরে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ সিলের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদের ঐতিহ্য ধরে রাখবে, নাকি প্রবেশ করবে ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট’ আইনসভার নতুন যুগে।

দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশ এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সংযুক্ত ‘গণভোট’ পাস হলে জাতীয় সংসদ হবে দুই স্তরবিশিষ্ট—যার শীর্ষে থাকবে ‘উচ্চকক্ষ’ এবং নিচে বর্তমানের মতো ‘নিম্নকক্ষ’। রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রস্তাবটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হতে পারে।

সাধারণত এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদে ৩০০ আসনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করেন। কিন্তু দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট ব্যবস্থায় আইনসভার একটি অতিরিক্ত অংশ (উচ্চকক্ষ) থাকে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এই উচ্চকক্ষ হবে তুলনামূলক ছোট কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী।

উচ্চকক্ষ মূলত একটি ‘ফিল্টার’ হিসেবে কাজ করবে। নিম্নকক্ষ অর্থাৎ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যখন কোনো আইন পাস করবেন, সেটি উচ্চকক্ষে পুনরায় পর্যালোচিত হবে। এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ রোধ করতে এবং তাড়াহুড়ো করে জনস্বার্থ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন ঠেকিয়ে দিতে দেয়াল হিসেবে কাজ করবে।

এবারের গণভোটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। যদি ভোটাররা এই সনদের পক্ষে রায় দেন, তবে সংসদীয় কাঠামোয় যে পরিবর্তনগুলো আসবে:

১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত মোট ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অর্থাৎ, কোনো দল যদি সারাদেশে ২০ শতাংশ ভোট পায়, তবে তারা উচ্চকক্ষে ২০টি আসন পাবে।

সংবিধান সংশোধনে কঠোরতা: সংবিধানের যেকোনো বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।

বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ: উচ্চকক্ষে সমাজের বিশিষ্টজন, বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে, যারা সরাসরি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে না পারলেও রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।

নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যা: প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্নকক্ষে সরাসরি নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা হতে পারে ৪০০, যার মধ্যে নারীদের জন্য ১০০টি সংরক্ষিত আসন থাকবে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় উঠে এসেছে যে, এই ব্যবস্থা সংসদকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। ছোট দলগুলো যারা সরাসরি আসনে জয়ী হতে পারে না, তারাও প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সমালোচকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ পরিচালনা করা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া দুই কক্ষের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় কাজে স্থবিরতা আসতে পারে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র