ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং দেশের বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে দেশে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা প্যাকেজের ঘোষণা দেন।

বিগত তিন বছর ধরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। একসময়ের ৫.৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে কমে ৪.২ শতাংশে এবং বর্তমানে তা ৩.৭ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মুখে দেশের তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস), টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং আমানতকারীদের চরম আস্থা সংকট বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এই বিশেষ স্কিম হাতে নিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন, “এই প্রণোদনা বাস্তবায়িত হলে বন্ধ কারখানাগুলো যেমন প্রাণ ফিরে পাবে, তেমনি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি পাবে। যা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার নিয়ে আসবে।”

এই খাতের আওতায় বড় এবং মাঝারি শিল্পের বড় অংশ কাভার করা হবে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে। এ ছাড়া সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরবঙ্গকে দেশের প্রধান ‘কৃষি হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য থাকছে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা।

এই তহবিল থেকে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সে ৫ হাজার কোটি, কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ৫ হাজার কোটি এবং পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিনিয়োগে ১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। সংকটে থাকা চামড়া শিল্পে ২ হাজার কোটি এবং হিমায়িত মাছ ও ফিশ এক্সপোর্টে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। তরুণদের জন্য স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি এবং সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে।

এই প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বেকারত্ব দূরীকরণ। যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে কর্মসংস্থান ব্যাংক। অন্যদিকে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হবে, যা লাখো আনসার ও ভিডিপি সদস্যের ভাগ্যবদল করবে। এ ছাড়া বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষায়িত ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ থেকে প্রায় ১ লাখ মানুষের বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ঋণের সুদের হার সাধারণ উদ্যোক্তাদের নাগালের মধ্যে রাখতে একটি সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ সরবরাহ করবে। ব্যাংকগুলো এর সাথে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ ‘স্প্রেড’ বা মুনাফা যোগ করতে পারবে। ফলে বড় ও মাঝারি ঋণগ্রহীতারা মাত্র ৭ শতাংশ সুদে এই ঋণ পাবেন। তবে ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি হওয়ায় সুদের হার কিছুটা বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ৬০ হাজার কোটি টাকার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতির জন্য একটি সময়োপযোগী ‘লাইফলাইন’। তবে এই বিপুল অর্থ যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছায় এবং কোনোভাবেই যেন নতুন খেলাপি ঋণের জন্ম না দেয়, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথ তদারকি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা গেলে, এই মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের শিল্প খাতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

প্রতিবেদক

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ব্যবসা-বাণিজ্য

২৫০ কর্মীর অসুস্থতায় বন্ধ হওয়া অ্যাপলের প্রতিষ্ঠান চালু হচ্ছে

নিম্নমানের খাবার খেয়ে ২৫০ জন কর্মী অসুস্থ হওয়ার প্রায় ১ মাস পর চালু হতে যাচ্ছে অ্যাপলের পণ্য সরবরাহকারী ফক্সকনের চেন্নাই