ডিএনএ বনাম লালন-পালন: মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে আসল কারিগর কে?
মানুষ কি জন্মগত স্বভাব নিয়েই পৃথিবীতে আসে, নাকি মানুষের ব্যক্তিত্ব চারপাশের পরিবেশ তাকে বদলে দেয়? শতাব্দী প্রাচীন এই ‘নেচার বনাম নার্চার’ বা ‘প্রকৃতি বনাম পরিবেশ’ বিতর্ক মনস্তত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের আজও ভাবিয়ে তুলছে।
সাম্প্রতিক আচরণগত জিনতত্ত্বের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ—উভয়েরই সমান ও পরিপূরক ভূমিকা রয়েছে।
জন্মসূত্র বনাম জীবনের অভিজ্ঞতা:
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষের চিন্তা, আবেগ এবং আচরণের সামগ্রিক বহিঃপ্রকাশই হলো তার ব্যক্তিত্ব। বহু বছর ধরে ধারণা করা হতো, সন্তানেরা কেবল বাবা-মায়ের চারিত্রিক গুণাবলি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি মোটেও এতটা সরল নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে এখন স্পষ্ট যে, মানুষ একটি নির্দিষ্ট জিনগত কাঠামো নিয়ে জন্মায় ঠিকই, কিন্তু সেই জিনের কার্যকারিতা কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা নির্ধারণ করে তার চারপাশের পরিবেশ।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন মানুষের জিনগতভাবে অত্যন্ত প্রতিভাবান বা রাগী হওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। কিন্তু সে যদি একটি শান্ত, নিয়মতান্ত্রিক এবং ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তবে তার সেই নেতিবাচক জিনগত প্রবণতাগুলো চাপা পড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, অনুকূল পরিবেশ না পেলে ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা কখনোই বিকশিত হয় না। অনেকটা মাটির নিচে থাকা বীজের মতো—বীজের গুণগত মান (জিন) যত ভালোই হোক না কেন, উপযুক্ত আলো, বাতাস ও পানি (পরিবেশ) না পেলে তা মহীরুহে পরিণত হতে পারে না।
জমজ শিশুদের ওপর করা বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর আলাদা পরিবেশে বড় হওয়া সত্ত্বেও তাদের কিছু মৌলিক আচরণে মিল থাকে। তবে তাদের জীবনের লক্ষ্য, মূল্যবোধ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। এর কারণ, শৈশবের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক শিক্ষা, বন্ধু সার্কেল এবং সংস্কৃতির প্রভাব মানুষের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ককে নতুন আকার দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘এপিজেনেটিক্স’ বলা হয়।
ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রধান নিয়ামকসমূহ
মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত গবেষণার আলোকে মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর দুই পক্ষের প্রভাবের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
-
জিনগত প্রভাব (নেচার): মানুষের বুদ্ধিমত্তা, মেজাজ (যেমন বহির্মুখী বা অন্তর্মুখী হওয়া) এবং কিছু মানসিক রোগের প্রবণতা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
-
পরিবেশগত প্রভাব (নার্চার): শৈশবের পারিবারিক আবহ, বাবা-মায়ের আচরণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জীবনের নানা ধাক্কা বা ট্রমা মানুষের বাকি ৫০ শতাংশ ব্যক্তিত্ব তৈরি করে।
-
যৌথ মিথস্ক্রিয়া: জিন মানুষকে একটি প্রাথমিক খসড়া দেয়, আর পরিবেশ সেই খসড়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্পে রূপান্তর করে। কোনো একটিকে বাদ দিয়ে মানুষের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, ব্যক্তিত্বের এই রহস্যময় দেয়াল ততই উন্মোচিত হচ্ছে। অপরাধ বিজ্ঞান থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রেও এখন এই তত্ত্বের প্রয়োগ বাড়ছে। শুধুমাত্র ‘খারাপ জিন’ বা ‘খারাপ পরিবেশ’ বলে কাউকে দাগিয়ে দেওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ব্যক্তিত্ব কোনো স্থবির বিষয় নয়, এটি আজীবন পরিবর্তনশীল। জিনগত সীমাকে জয় করে একটি সুস্থ, ইতিবাচক এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে যেকোনো মানুষের ভেতরে থাকা সেরা সত্তাটিকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব।





