জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত, নামাজ আদায় করলেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী
সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত উদযাপিত হয়েছে। সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ জামাতে দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই কাতারে শামিল হয়ে নামাজ আদায় করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পবিত্র উৎসবের চিরন্তন নিয়মে ধনী-দরিদ্রের সব ভেদাভেদ ভুলে সকাল থেকেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান। কড়া নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে সাধারণ নাগরিক, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কূটনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই মাঠে সমবেত হতে শুরু করেন। ঈদগাহের প্যান্ডেলে সর্বস্তরের মানুষের এই মহামিলন যেন একতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
আজকের এই প্রধান জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। নামাজ শেষে খুতবায় তিনি ত্যাগের মহিমায় জীবন গড়ার আহ্বান জানান। এরপরই সমগ্র দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং উত্তরোত্তর অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতে দেশের মানুষের কল্যাণ কামনায় সুদীর্ঘ আকুতি জানানো হলে সমবেত হাজারো কণ্ঠে ‘আমিন’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়।
জাতীয় ঈদগাহের মূল চিত্রপট:
১৫ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় প্রতি বছরই ঈদগাহের এই মহামিলন কভার করার সুযোগ হয়। তবে এবারের বিন্যাস ও সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক আজকের জামাতের মূল দিকগুলো:
-
নির্ধারিত সময়সূচি: ঘড়ির কাঁটা ঠিক সকাল সাড়ে সাতটা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ, যা শৃঙ্খলার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে।
-
রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি: দেশের দুই প্রধান অভিভাবক—রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক মাঠে নামাজ আদায় করে উৎসবের আনন্দ সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
-
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং র্যাবের পক্ষ থেকে কয়েক স্তরের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল। সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে পুরো এলাকা সুরক্ষিত রাখা হয়।
-
নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: প্রতি বছরের মতো এবারও নারী ও পুরুষ মুসল্লিদের জন্য ঈদগাহ ময়দানে আলাদা প্রবেশ পথ ও নামাজ আদায়ের সুনির্দিষ্ট প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছিল।
-
ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক মেলবন্ধন: মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদেশি কূটনীতিকরা এই প্রধান জামাতে অংশ নিয়ে বাঙালির ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
নামাজ শেষে সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বার্তা
নামাজ ও দীর্ঘ মোনাজাত শেষ হওয়ার পর ঈদগাহ ময়দান রূপ নেয় এক চিরচেনা উৎসবের প্রাঙ্গণে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নামাজ শেষে প্যান্ডেল থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত মুসল্লিদের হাত নেড়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানান এবং কুশল বিনিময় করেন। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ দুই ব্যক্তির এই সাধারণের মাঝে মিশে যাওয়ার দৃশ্য উপস্থিত মাঠের আমেজকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সাংবাদিকতার চশমা দিয়ে দেখলে, জাতীয় ঈদগাহের এই প্রধান জামাত কেবল একটি ধর্মীয় আচার মাত্র নয়; এটি মূলত বাঙালির জাতীয় সংহতির এক অনন্য প্রদর্শন। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা মতপার্থক্য ভুলে এই একটি মাঠে যেভাবে সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি পর্যন্ত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেজদা করেন, তা সংকটের সময়েও সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এক সুগভীর শক্তি যোগায়।
সম্প্রীতির আবহে আগামীর প্রত্যাশা
ঈদুল আজহা আমাদের মূলত ত্যাগের শিক্ষা দেয়, নিজের ভেতরের অহংকার ও পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দিতে শেখায়। জাতীয় ঈদগাহে আজকের এই সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জমায়েত প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষ শান্তি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পক্ষে।
জাতীয় জীবনের চলমান নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে প্রত্যয়, আজকের ঈদের প্রাঙ্গণে তা যেন আরও একবার নতুন করে প্রাণ পেল।
উৎসবের এই পুণ্য আলো ধরে রেখে দেশের মানুষ আগামী দিনগুলোতে একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে যাবে—জাতীয় ঈদগাহের এই বিশাল জমায়েত শেষে এটাই হোক সবার মূল প্রত্যাশা।





