এস আলমের মামলার বিরুদ্ধে লড়বে ব্রিটিশ ল ফার্ম, ঘণ্টায় ফি দেড় লাখ টাকা
আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে (আইসিএসআইডি) এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের দায়ের করা মামলা মোকাবিলায় বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ ল ফার্ম ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি’-কে নিয়োগ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
এই আইনি লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট ফার্মটিকে প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা) ফি প্রদান করতে হবে।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই নিয়োগ ও আনুষঙ্গিক অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই আন্তর্জাতিক আইনি সেবা ক্রয়ের প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়েছিল।
পটভূমি ও মামলার কারণ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এস আলম পরিবার ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার করেছে।
এই পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং দেশের ভেতরে থাকা তাদের বিভিন্ন সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওয়াশিংটনে অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে (আইসিএসআইডি) বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
গত বছরের অক্টোবরে করা এই মামলায় তারা অভিযোগ করেছেন যে, সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ জব্দ করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির লঙ্ঘন করেছে।
আইনি লড়াইয়ের ব্যায় ও চ্যালেঞ্জ
বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, এস আলম পরিবার সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই শুরু করেছে।
তিনি বলেন, “তারা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থায় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল আইনি প্রক্রিয়া। দেশের স্বার্থ রক্ষায় এবং অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান তুলে ধরতে দক্ষ আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগের বিকল্প নেই।”
আইসিএসআইডিতে দায়ের করা এই মামলার নম্বর ‘এআরবি/২৫/৫২’। ব্রিটিশ ল ফার্মটিকে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ ডলার দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই হার অত্যন্ত সাধারণ হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় আর্থিক দায়। তবে পাচার হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে এই বিনিয়োগকে অপরিহার্য বলে মনে করছে সরকার।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলাটি কেবল সরকারের বিরুদ্ধে একটি আইনি চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারের পথে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কৌশল। সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবার ২০২০ সালে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যা এখন তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা দাবি করার ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
সরকার যদি এই মামলায় জয়ী হতে পারে, তবে তা বিদেশের মাটিতে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
অন্যদিকে, আইনি লড়াইয়ে ব্যর্থ হলে সরকারকে বড় অঙ্কের জরিমানা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে পড়তে হতে পারে। ফলে ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেইস’-এর ওপর এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশের কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ পুনরুদ্ধারের ভাগ্য।





