এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিট কেন? সময়ের এই রহস্যের পেছনে হাজার বছরের ইতিহাস
আমরা প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটা দেখি, সময় মাপি, কিন্তু এক ঘণ্টা ৬০ মিনিট কেন, তা ভেবে দেখেছি কি? প্রাচীন সভ্যতার গণনার পদ্ধতি থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রভাব, সময় ভাগের এই ধারণার পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক গল্প।
সময় আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিন, ঘণ্টা, মিনিট; সবকিছুই নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। কিন্তু এই ছকের পেছনের যুক্তি অনেকেরই অজানা। বিশেষ করে প্রশ্নটি- এক ঘণ্টা কেন ৬০ মিনিটে ভাগ করা হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সভ্যতায়। তখনকার সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয়রা গণনার জন্য ব্যবহার করতেন “ষাটভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি” বা সেক্সাজেসিমাল সিস্টেম। অর্থাৎ, তারা সংখ্যা গুনতেন ১০ নয়, বরং ৬০ ভিত্তিতে।
এই ৬০ সংখ্যাটির বিশেষত্ব ছিল এর বিভাজ্যতা। ৬০ সংখ্যা ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০, ৩০—এমন বহু সংখ্যায় নিখুঁতভাবে ভাগ করা যায়। ফলে ভগ্নাংশ বা হিসাব সহজ হয়ে যেত। জ্যোতির্বিজ্ঞান, জমির পরিমাপ কিংবা সময় গণনায় এটি ছিল অত্যন্ত সুবিধাজনক।
প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের নক্ষত্র ও সূর্যের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সময় নির্ধারণ করতেন। তারা দিনকে ২৪ ভাগে ভাগ করেন—যা আজকের ২৪ ঘণ্টার ধারণা। এরপর প্রতিটি ঘণ্টাকে আবার ৬০ ভাগে ভাগ করা হয়, যা থেকে আসে ৬০ মিনিটের ধারণা।
এই পদ্ধতি ধীরে ধীরে গ্রিক ও রোমান সভ্যতার মাধ্যমে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যযুগে যান্ত্রিক ঘড়ির আবিষ্কারের পর সময় পরিমাপ আরও নির্ভুল হয়, এবং ৬০ মিনিটের এই কাঠামো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়।
আধুনিক যুগে এসে আন্তর্জাতিকভাবে সময়ের মান নির্ধারণে “সেকেন্ড”কে ভিত্তি ধরা হলেও, ঘণ্টা ও মিনিটের এই পুরোনো বিভাজন এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এমনকি ডিজিটাল ঘড়ি, কম্পিউটার বা মহাকাশ গবেষণায়ও এই ঐতিহাসিক কাঠামোই ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি জনপ্রিয় হলেও সময়ের ক্ষেত্রে ৬০ ভিত্তিক পদ্ধতি বেশি কার্যকর। কারণ, এটি বিভিন্ন ভাগে সহজে বিভক্ত করা যায়—যা দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও সুবিধা দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে:
- এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিট হওয়ার ধারণা এসেছে ব্যাবিলনীয়দের ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি থেকে
- ৬০ একটি উচ্চ বিভাজ্য সংখ্যা, যা গণনাকে সহজ করে
- দিনকে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করার ধারণা এসেছে প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ থেকে
- আধুনিক প্রযুক্তিতেও এই সময় কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে
- সময় পরিমাপের এই পদ্ধতির বয়স প্রায় ৪ হাজার বছর
আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে সময় যেন আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বা হাতঘড়িতে আমরা যে মিনিট গুনি, তার পেছনে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার মেধা ও পর্যবেক্ষণ।





