বিশ্ব তেলের বাজার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ প্রভাবিত করতে এক সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক চাল চেলেছে ইরান। তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম চড়া রাখা, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়বে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। এই কৌশলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালীকে। ইরান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই প্রণালীতে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্য প্রদর্শন করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের চাবিকাঠি নিজেদের মুঠোয় রাখার চেষ্টা করছে।
এক নজরে মূল ভূ-রাজনৈতিক তথ্যগুলো:
- তেহরানের মূল চাল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারকে কৃত্রিমভাবে উত্তপ্ত রাখা।
- হরমুজের গুরুত্ব: বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়।
- সামরিক কৌশল: প্রণালীর আশেপাশে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) ড্রোন, সাবমেরিন ও দ্রুতগামী নৌযানের টহল বৃদ্ধি।
- মার্কিন চাপ: তেলের চড়া দামের কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়লে তা সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ফলাফলে আঘাত হানবে।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত অবস্থান ও ইরানের সামরিক বেষ্টনী
মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থল হলো হরমুজ প্রণালী। এটি এমন এক ভৌগোলিক প্রবেশদ্বার যার নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে রয়েছে। তেহরানের সামরিক নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই জানেন যে, এই প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতা তৈরি করতে পারলেই বিশ্ব তেলের বাজার মুহূর্তের মধ্যে অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান এই জলসীমায় তাদের নৌ-মহড়া এবং নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানি নৌবাহিনী ও আইআরজিসি এই রুটে চলাচলকারী পশ্চিমা কার্গো জাহাজ এবং ওয়েল ট্যাংকারগুলোর ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। উন্নত রাডার সিস্টেম এবং উপকূলীয় অ্যান্টি-শিপ মিসাইল মোতায়েন করে ইরান বার্তা দিচ্ছে যে, তারা চাইলে যেকোনো মুহূর্তে এই রুট অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এই প্রচ্ছন্ন হুমকিই বিশ্ববাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দামকে নিম্নমুখী হতে দিচ্ছে না।
মার্কিন নির্বাচনকে যেভাবে প্রভাবিত করছে তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তেলের দাম সবসময়ই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পর্শকাতর বিষয়। মার্কিন ভোটাররা ব্যালট বাক্সে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানির মূল্য ও মূল্যস্ফীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ওপেকের (OPEC) অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে ইরান চাইছে না এই মুহূর্তে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ুক। তারা রাশিয়া ও ওপেকের অন্যান্য মিত্রদের সাথে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ রাখছে যাতে তেলের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
যদি মার্কিন নির্বাচনের ঠিক আগে আমেরিকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে, তবে তা ক্ষমতাসীন প্রশাসনের জন্য মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। ভোটারদের ক্ষোভকে পুঁজি করে বিরোধী শিবির সহজেই ফায়দা তুলতে পারবে। ওয়াশিংটনকে এই চরম মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রাখাই হলো তেহরানের মূল এজেন্ডা, যা তারা হরমুজের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখে সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে।
সংকীর্ণ জলপথ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২১ মাইল চওড়া, যার মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য উপযোগী রুটটি মাত্র দুই মাইলের। এই চরম ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেকোনো ছোটখাটো সামরিক সংঘাত বা ট্যাংকার আটক করার ঘটনা পুরো বিশ্ববাণিজ্যকে স্থবির করে দিতে পারে। এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি যেমন চীন, জাপান ও ভারত তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির সিংহভাগ এই রুট থেকেই আমদানি করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা নাও করে, তবুও হরমুজে তাদের এই “ধীরে চলো” নীতি এবং প্রতিনিয়ত ট্যাংকার তল্লাশির প্রক্রিয়াটি চালানি খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানিগুলো এই রুটে চলাচলকারী জাহাজের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ছে বিশ্ব তেলের বাজার ও সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে।
কূটনৈতিক লড়াই ও ভবিষ্যতের সমীকরণ
আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে জলপথটি নিরাপদ রাখার দাবি করলেও ইরানের হাইব্রিড যুদ্ধকৌশলের সামনে তা সম্পূর্ণ কার্যকর হচ্ছে না। তেহরান সরাসরি কোনো আইনি লঙ্ঘন না করে কেবল নিরাপত্তার অজুহাতে যেভাবে চাপ তৈরি করছে, তা আধুনিক কূটনীতির এক নতুন নজির।
মার্কিন নির্বাচন পার হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই স্নায়ুযুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। ইরান তাদের এই তেলের চালের মাধ্যমে পশ্চিমাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য একটি শক্তিশালী দর কষাকষির হাতিয়ার তৈরি করে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই তেলের রাজনীতি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে নিয়ে যায়, আন্তর্জাতিক মহল এখন সেদিকেই গভীর নজর রাখছে।