ডেঙ্গু মোকাবিলায় আহ্বান জানিয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন নিজ নিজ বাসস্থান ও চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশজুড়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারপ্রধান এই জরুরি নির্দেশনা দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধুমাত্র সরকারি বা সিটি কর্পোরেশনের তৎপরতার ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না, বরং ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি সাধারণ মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এক নজরে প্রধানমন্ত্রীর মূল নির্দেশনাসমূহ:
-
- পরিচ্ছন্নতার সময়সূচী: প্রতি সপ্তাহের অন্তত দুই দিন নিজ উদ্যোগে বাসা-বাড়ি এবং কর্মস্থল পরিষ্কার করতে হবে।
- মূল টার্গেট: ফুলের টব, ছাদ, ফ্রিজের ট্রে বা ভাঙা পাত্রে জমে থাকা এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করা।
- স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ: দেশের প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাকে মশা নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার তাগিদ।
- চিকিৎসা প্রস্তুতি: ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারি হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ।
প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বার্তা ও জনগণের ভূমিকা
সারাদেশে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের গ্রাফ প্রতিনিয়ত ওপরের দিকে উঠছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘরের কোণে কিংবা আঙিনায় পানি জমিয়ে রেখে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করলে রাষ্ট্র একা কিছু করতে পারবে না। এ কারণেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, সামান্য একটু অসচেতনতার কারণে নিজের সন্তান কিংবা পরিবারের সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই প্রতি শুক্র ও শনিবার অথবা সুবিধাজনক যেকোনো দুই দিন ঘরের ফ্রিজের নিচের অংশ, এসির পানি জমার ট্রে এবং বেলকনি পরিষ্কার করা জরুরি। এতে মশার বংশবৃদ্ধি প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
মশা নিধনে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের সকল পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের মাঠ পর্যায়ে কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন। যেসব নির্মাণাধীন ভবন, বহুতল আবাসিক এলাকা কিংবা সরকারি দপ্তরে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বক্তব্যে বলা হয়, ডোবা-নালা পরিষ্কার এবং নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানোর কাজে কোনো ধরণের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার জনগণকে সাথে নিয়ে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মশা মারার ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য ল্যাব টেস্টের ওপরও জোর দেন সরকারপ্রধান।
হাসপাতালগুলোর জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য গাইডলাইন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক নির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের কোনো জেলা বা উপজেলা হাসপাতালের রোগীরা যেন সঠিক সময়ে ডেঙ্গুর টেস্ট এবং প্রয়োজনীয় ফ্লুইড বা স্যালাইন থেকে বঞ্চিত না হয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্লিনিকগুলোতে প্লাটিলেট কাউন্ট এবং মশারির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষকে সচেতন করে বলা হয়েছে, সামান্য জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরণের পেইন কিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে চিকিৎসায় কোনো ধরণের বিলম্ব না হয়।
সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু কোনো একক সংস্থার সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। mosques এর ইমামদের জুমার খুতবায় পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একটি সুস্থ ও ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের সাথে জনগণের কর্মপরিকল্পনার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া বার্তার পর দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ নিজেদের চারপাশ পরিষ্কারে কতটা উদ্বুদ্ধ হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।