অপরাধ দেশ সংযোগ ফিচার

গণপরিবহন থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, সর্বত্র ভয়াবহ মাত্রায় বাড়ছে যৌন হয়রানি: ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ উভয়ই

গণপরিবহন ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় মানসিক চাপ ও হয়রানির শিকার একজন সাধারণ নাগরিক।
বর্তমানে আমাদের সমাজে যৌন হয়রানি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঘরের বাইরে গণপরিবহন কিংবা হাতের মুঠোয় থাকা সোশ্যাল মিডিয়া—কোথাও কোনো নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকলজ্জা আর আইনি জটিলতার ভয়ে অনেকেই এই তীব্র মানসিক নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, এটি আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গের একক সমস্যা নয়। আধুনিক এই নাগরিক জীবনে নারী ও পুরুষ উভয়ই প্রতিনিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ফর্মে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তোলে।
এক নজরে মূল তথ্যসমূহ:
  • গণপরিবহন ও ট্রাফিকের মাঝে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের একটি বড় অংশও বিভিন্নভাবে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় মেসেজ ইনবক্স, ট্রোলিং এবং ফেক আইডির মাধ্যমে ভার্চুয়াল হ্যারাসমেন্ট মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
  • পুরুষ ভুক্তভোগীরা সামাজিক ট্যাবু এবং উপহাসের ভয়ে নিজেদের ওপর হওয়া নির্যাতন প্রকাশ করতে পারেন না।
  • কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে এই নীরব ব্যাধি সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেবে।
গণপরিবহনের দমবন্ধ পরিস্থিতি ও নিত্যদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা
রাজধানীসহ দেশের যেকোনো প্রান্তের গণপরিবহনগুলোর দিকে তাকালে এক চরম অস্বস্তিকর চিত্র ফুটে ওঠে। অফিস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাতায়াতের সময় বাসের ভেতরে গাদাগাদি ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার মানুষ এই নোংরামি মেতে ওঠে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। ভিড়ের মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্পর্শ, আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি কিংবা অশালীন মন্তব্য এখন নিত্যদিনের চেনা চিত্র।
তবে এই মুদ্রার অপর পিঠও রয়েছে, যা সচরাচর আলোচনাতেই আসে না। বাসে বা ট্রেনে যাতায়াতের সময় অনেক পুরুষও কিন্তু সমানভাবে হেনস্থার শিকার হন। পকেটমার বা সিট নিয়ে বাগবিতণ্ডার আড়ালে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পুরুষ যাত্রীদেরও শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা করার নজির দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু পুরুষদের জন্য কোনো আইনি বা সামাজিক সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম না থাকায় তারা বিষয়টি স্রেফ চেপে যান।
ভার্চুয়াল জগৎ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন ফাঁদ
বাস্তব জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে এই বিষাক্ত থাবা এখন গ্রাস করেছে ডিজিটাল দুনিয়াকেও। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা লিঙ্কডইনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিনিয়ত এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অপরিচিত আইডি থেকে আপত্তিকর ছবি পাঠানো, ইনবক্সে নোংরা টেক্সট কিংবা মন্তব্য করার মাধ্যমে সাইবার বুলিং এখন চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক সময় ছবি বিকৃত করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন বহু তরুণ-তরুণী।
ভার্চুয়াল জগতের এই হ্যারাসমেন্টের ধরন পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা আলাদা হলেও এর মানসিক ট্রমা বা প্রভাব কিন্তু একই রকম। নারীরা যেখানে সরাসরি কুপ্রস্তাব বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হন, সেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ফেক আইডি দিয়ে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলে। এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে বাঁচতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সামাজিক ট্যাবু ও পুরুষ ভুক্তভোগীদের নীরব কান্না
আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে কেবল নারীরাই হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে পারেন। এই মানসিকতার কারণে যখন কোনো পুরুষ নিজের সাথে ঘটা কোনো অন্যায়ের কথা বলতে যান, তখন তাকে উল্টো উপহাসের পাত্র হতে হয়। “পুরুষ হয়ে কীভাবে হেনস্থার শিকার হলেন?”—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে সিংহভাগ পুরুষ ভুক্তভোগী আজীবন চুপ থাকেন। এই নীরবতা অপরাধীদের আরও বেশি সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা ভুক্তভোগীর আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা, হতাশা এবং সমাজবিমুখতা তৈরি হয় তাদের মধ্যে। কোনো সুস্থ সমাজ এভাবে চলতে পারে না যেখানে অর্ধেক জনগোষ্ঠী তাদের কষ্টের কথা সমাজ বা আইনের কাছে প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করে। তাই এই বিষয়ে পুরুষদের কথা শোনার এবং তাদের আইনি অধিকার দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ ও আমাদের করণীয়
বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং তাৎক্ষণিক বিচার না হওয়া এই অপরাধ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বাসে বা রাস্তায় কোনো ঘটনার পর ভুক্তভোগীকে যেভাবে আইনি প্রক্রিয়ার ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাতে অনেকেই মামলা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। গণপরিবহনগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য বিশেষ সেল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে হবে আমাদের পারিবারিক শিক্ষায়। পরমতসহিষ্ণুতা এবং অপর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছোটবেলা থেকেই শেখানো উচিত। শুধু আইন করে বা শাস্তি দিয়ে এই মানসিক বিকারগ্রস্ততা দূর করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না আমরা প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখব, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার