রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে গোলাগুলি এবং ব্যাপক সহিংসতার পর বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে যৌথ বাহিনী। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর ২০২৬) সকাল থেকে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুপুরের দিকে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলেও বিকেল নাগাদ থমথমে শান্ত ভাব ফিরে এসেছে এবং অবরুদ্ধ থাকা প্রায় ৩ হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সাজেকের সবশেষ পরিস্থিতি একনজরে:
- উজোবাজার ও গঙ্গারাম বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ।
- ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি বর্ষণের দাবি আইএসপিআরের।
- সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে আটকে পড়া প্রায় ৩ হাজার পর্যটককে সেনাবাহিনীর বিশেষ পাহারায় উদ্ধার।
- সংঘর্ষের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন এবং এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
যেভাবে শুরু হলো রণক্ষেত্র ও সাজেকে গোলাগুলি
পাহাড়ের স্থানীয় দুটি সংগঠন ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’ তাদের ৩ দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। অবরোধ সমর্থকেরা সকাল থেকেই বাঘাইহাট-সাজেক সড়কের উজোবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ার জ্বালিয়ে যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে সকাল সাড়ে আটটার দিকে সাজেক ভ্যালি থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রায় ৪৫০টি গাড়ির একটি বিশাল বহর মাঝরাস্তায় আটকে পড়ে।
বেলা ১১টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা দিয়ে পার করার উদ্যোগ নিলে অবরোধকারীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই সময় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সদস্যরা সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যৌথ বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে শুরু হয় সাজেকে গোলাগুলি ও পাল্টা জবাব।
ইউপিডিএফের পাল্টা দাবি ও প্রশাসনের বক্তব্য
নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালানোর এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছে ইউপিডিএফ। সংগঠনটির মুখপাত্র আংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে জানান, স্থানীয়দের শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ ছত্রভঙ্গ করার জন্য নিরাপত্তা কর্মীরাই বিভিন্ন দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে এবং সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়েছে। তবে রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের হামলায় ও সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৯ জন সদস্য আহত হয়েছেন। বর্তমানে পুরো এলাকা যৌথ বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।
৩ হাজার পর্যটককে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর
পাহাড়ে হঠাৎ করে সাজেকে গোলাগুলি শুরু হওয়ায় বেড়াতে আসা হাজারো পর্যটকের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই গাড়ির ভেতরে এবং রাস্তার পাশের দোকানপাটে আশ্রয় নেন। দুপুরের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন ও পুলিশের একটি যৌথ দল বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে।
বিকেল ৪টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে সবকটি পর্যটকবাহী গাড়িকে এসকর্ট দিয়ে নিরাপদে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে পৌঁছে দেওয়া হয়। এদিকে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বারবার অবরোধ ও পাহাড়ে অস্থিরতার কারণে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।