মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোকাবিলা এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসি-কে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখার জোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রবীণ কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত আগ্রাসনে মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষ যখন চরম সংকটের মুখে, তখন ওআইসির মতো একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক ফোরামের এমন নীরব ও নিস্পৃহ ভূমিকা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করেন তিনি। সম্প্রতি ঢাকার এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য নিয়ে আলোচনাকালে তিনি এই গভীর উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন, যা মুসলিম বিশ্বের নীতি-নির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
সংঘাত ও ওআইসির ভূমিকা নিয়ে মূল পয়েন্টসমূহ:
-
- কার্যকর ভূমিকার দাবি: মুসলিম বিশ্বের সংকট নিরসনে ওআইসিকে কেবল বিবৃতি দেওয়ার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান।
- মানবিক বিপর্যয়: গাজা ও লেবাননে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে যৌথ আরব-মুসলিম ফ্রন্ট গঠনের তাগিদ।
- জাতিসংঘের ব্যর্থতা: পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর ভেটো ক্ষমতার কারণে জাতিসংঘ শান্তি ফেরাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিকল্প উদ্যোগের ওপর জোর।
- কূটনৈতিক একতা: মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে চাপ সৃষ্টির পরামর্শ।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ট্র্যাজেডি ও ওআইসির দুর্বল অবস্থান
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও ওআইসি কেন মুসলিম দেশগুলোর ওপর চলা আগ্রাসন থামাতে পারছে না, সেই মৌলিক প্রশ্নটি এখন বিশ্বমঞ্চে বেশ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির তার বিশেষ সেশনে উল্লেখ করেন, গাজায় বছরের পর বছর ধরে চলা মানবিক বিপর্যয় এবং সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে ছড়ানো যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের চরম অভাব রয়েছে। এই সংকটময় সময়ে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোকাবিলা করার জন্য যে ধরণের সুনির্দিষ্ট এবং বৈপ্লবিক কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল, ওআইসি তা নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্থাটির নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলনগুলো এখন কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক নিন্দা প্রস্তাব এবং অর্থহীন কাগুজে বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মাঠ পর্যায়ে এর কোনো বাস্তব রাজনৈতিক বা সামরিক প্রভাব না থাকায় আগ্রাসনকারীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সাধারণ মুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় ওআইসিকে নিজেদের আইনি ও কূটনৈতিক কাঠামোর আমূল সংস্কার করতে হবে।
মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহারের পরামর্শ
হুমায়ুন কবির মনে করেন, মুসলিম দেশগুলোর হাতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের দাবি আদায়ে এই অর্থনৈতিক শক্তিকে ওআইসির মাধ্যমে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি তেল সরবরাহ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সম্মিলিত ও কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারত, তবে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে এভাবে অবমূল্যায়ন করার সাহস পেত না।
এবারের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোকাবিলা করতে হলে আরব লিগ এবং ওআইসি-কে একযোগে কাজ করতে হবে। মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো যেমন—সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক এবং কাতারকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে একটি সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই দেশগুলোর একক কণ্ঠস্বরই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে।
জাতিসংঘের ব্যর্থতা ও আঞ্চলিক জোটের গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল চালিকাশক্তি জাতিসংঘ এখন পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক ভেটো দেওয়ার কারণে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় হুমায়ুন কবির আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট এবং ওআইসির নিজস্ব সালিশি ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন।
যদি ওআইসি নিজস্ব একটি শক্তিশালী শান্তি রক্ষা বাহিনী বা বিশেষ কূটনৈতিক প্যানেল গঠন করতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। মুসলিম দেশগুলোর উচিত হবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করা যাতে যেকোনো বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা একযোগে আইনি ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের অবস্থান ও ভবিষ্যতের কূটনৈতিক রূপরেখা
বাংলাদেশ সবসময়ই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। হুমায়ুন কবির মনে করেন, ওআইসির অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের উচিত হবে এই ফোরামটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে অন্যান্য সমমনা দেশগুলোর সাথে লবিং জোরদার করা।
ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। ওআইসি যদি এই সংকটের মুহূর্তে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সংস্থার প্রাসঙ্গিকতা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।