মজুরি বোর্ড পোশাক শিল্পে কর্মরত লাখ লাখ মেহনতি মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবি ও প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে আবারও আনুষ্ঠানিক সভায় বসতে যাচ্ছে। দেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের সব শ্রেণির শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিম্নতম মজুরি পুনর্বিন্যাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সময়োপযোগী বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মাঝে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
একনজরে নতুন মজুরি কাঠামোর মূল দিকগুলো
- দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি হারের খাসড়া প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত এই বিশেষ বোর্ডে মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে পৃথক লিখিত প্রস্তাব পেশ করবে।
- জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতনের গ্রেডভিত্তিক পুনর্বিন্যাস করা এই সভার প্রধান লক্ষ্য।
- চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পূর্বে অংশীজনদের আপত্তি ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমান বেতন কাঠামো এবং শ্রমিকদের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত যার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই পোশাক খাতের শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে বর্তমান বাজার বাস্তবতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দামের কারণে এই সামান্য আয়ে একটি পরিবারের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যেন জীবনযাত্রার নূন্যতম মান বজায় রাখার মতো একটি বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হয়। সেই যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতেই সরকার শেষ পর্যন্ত নতুন কাঠামো গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি গ্রাস করে চলেছে সাধারণ শ্রমিকের আয়ের সিংহভাগ, যার ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে মাঝেমধ্যেই শ্রমিক অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে দেখা যায়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং কারখানার উৎপাদনশীলতা সচল রাখতে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করাই এই বোর্ডের মূল চ্যালেঞ্জ।
অংশীজনদের পৃথক প্রস্তাবনা ও সমন্বয়ের নতুন উদ্যোগ
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সভাকক্ষে আয়োজিত এই দ্বিতীয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন বোর্ডের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান। এই কার্যক্রমে মূলত বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৬) এর সুনির্দিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সভার মূল আলোচ্যসূচিতে রয়েছে গার্মেন্টস শিল্পের মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া পৃথক লিখিত প্রস্তাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ। শ্রমিক পক্ষ চাচ্ছে তাদের নূন্যতম জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের নিশ্চয়তা, অন্যদিকে মালিক পক্ষের চিন্তা বিশ্ববাজারে পণ্যের উৎপাদন খরচ ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রেড-১ থেকে শুরু করে শিক্ষানবিস স্তর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বেসিক বা মূল বেতন এবং অন্যান্য ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করা হবে। বার্ষিক মূল মজুরি বৃদ্ধির (Increment) হারও এই নীতিমালার আলোকেই পুনঃস্থির করার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক সুফল
তৈরি পোশাক শিল্পের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে দক্ষ এবং সন্তুষ্ট শ্রমশক্তির কোনো বিকল্প নেই। একটি যুগোপযোগী ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো কেবল শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানই বাড়াবে না, বরং কারখানায় কাজের পরিবেশ ও শ্রম-অসন্তোষ স্থায়ীভাবে দূর করতে ভূমিকা রাখবে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে; ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলো হুট করে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধির চাপ সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়েও বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির ফলে সাময়িকভাবে উৎপাদন খরচ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে অর্থের তারল্য ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে। এখন দেখার বিষয়, উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে কত দ্রুত একটি ফলপ্রসূ ও চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হয়।