মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দাবিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এখন এক নতুন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মোড় নিয়েছে। তেহরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গাজা এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা ওয়াশিংটনের ওপর কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বজায় রাখবে। কোনো ধরনের সাময়িক বা একপাক্ষিক সমঝোতার ফাঁদে পা না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কোণঠাসা করার নীতিতে হাঁটছে ইরান।
প্রতিবেদনের মূল চুম্বক অংশ:
- গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধে ওয়াশিংটনের ওপর ইরানের সর্বাত্মক চাপ।
- কোনো ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন বা দুর্বল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান তেহরানের।
- প্রতিরোধ ফ্রন্ট বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ অক্ষকে সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা সচল রাখার ঘোষণা।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা।
ওয়াশিংটনের ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টির কৌশল
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক কমান্ডারদের যৌথ সভার পর এটি পরিষ্কার যে, তেহরান এখন আর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই। তারা মনে করে, ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন অস্ত্র ও অর্থ সহায়তাই মধ্যপ্রাচ্যে রক্তপাতের প্রধান কারণ। তাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করাই এখন ইরানের প্রধান লক্ষ্য। ওআইসি এবং অন্যান্য মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তারা একটি বড় কূটনৈতিক ব্লক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই চলমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে ইরান যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দামকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। তেহরান হুঙ্কার দিয়েছে, পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে না যদি না তারা আগ্রাসন বন্ধ করে। এই হুঁশিয়ারি ওয়াশিংটনের সামরিক নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
প্রতিরোধ ফ্রন্টের পাশে থাকার অনড় অবস্থান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন জোগানো তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। পশ্চিমাদের কোনো হুমকি বা নিষেধাজ্ঞা এই নীতি থেকে তাদের সরাতে পারবে না। মার্কিন প্রশাসন চেয়েছিল ইরানকে আলোচনা টেবিলে এনে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করাতে। কিন্তু তেহরান সেই ফাঁদে পা দেয়নি।
তারা সাফ জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইসরায়েলকে নিঃশর্তভাবে পিছু হটতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন বৈশ্বিক দরবারে নিজেকে শান্তিপ্রিয় হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই ইরান এই ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেওয়ার নীতি নিয়েছে। চলমান ইরান যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমিত করার একমাত্র চাবিকাঠি এখন পুরোপুরি ওয়াশিংটনের কোর্টে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে এক দীর্ঘমেয়াদি রূপ দিতে পারে। তবে তেহরানের দাবি, তারা যুদ্ধ বাড়াতে চায় না, বরং আন্তর্জাতিক আইন মেনে স্থায়ী সমাধান চায়। কিন্তু সেই সমাধান যদি ফিলিস্তিনি ও লেবাননের জনগণের অধিকার রক্ষা না করে, তবে কোনো আলোচনা সফল হবে না। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি এই বার্তাটি অত্যন্ত জোরালোভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে, আরব বিশ্বের জনমতকে নিজেদের পক্ষে রেখে আমেরিকার দ্বিমুখী নীতিকে পরাস্ত করাই এখন ইরানের মূল এজেন্ডা। ওয়াশিংটন যদি তাদের মিত্র ইসরায়েলকে লাগাম পরাতে ব্যর্থ হয়, তবে এই সংঘাতের আগুন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। আর তার দায়ভার সম্পূর্ণভাবে মার্কিন প্রশাসনকেই নিতে হবে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান।